কক্সবাজার জেলা আনসার ও ভিডিপি কার্যালয়ে ভিডিপি সদস্য অন্তর্ভুক্তি, মৌলিক প্রশিক্ষণের তালিকা, নির্বাচন ও বিভিন্ন বিশেষ ডিউটি বণ্টনকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং অর্থ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন দলনেতা রহিম। একই সঙ্গে তার কর্মকাণ্ডে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয় রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী ও ভিডিপি সদস্য।
অভিযোগকারীদের দাবি, ভিডিপির নতুন অন্তর্ভুক্তি কিংবা মৌলিক প্রশিক্ষণের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ এবং অর্থ লেনদেন প্রাধান্য পাচ্ছে। এতে প্রকৃত আগ্রহী ও দরিদ্র বেকার যুবকদের অনেকেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ডিউটি বণ্টনে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন, দুর্গাপূজা, আয়কর অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিশেষ ডিউটি এবং অন্যা ন্য দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন ভিডিপি সদস্যের দাবি, ডিউটি পেতে তাদের কাছ থেকে ‘অফিস খরচ’ বা বিভিন্ন অজুহাতে টাকা চাওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভিডিপি সদস্য বলেন, “ডিউটি মানেই রহিমের জন্য টাকা তোলার মৌসুম। টাকা না দিলে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। অথচ তার আত্মীয়-স্বজনরা নিয়মিত সুযোগ পেয়ে থাকেন।”আরেক সদস্য অভিযোগ করেন, কক্সবাজার আয়কর অফিসে নিয়োগ পরীক্ষার ডিউটির জন্য জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানতে পারেন। টাকা দিতে না পারায় তাকে ডিউটি দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে দলনেতা রহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
পৌরসভা ডিউটি নিয়েও প্রশ্ন কক্সবাজার পৌরসভার ১২টি ওয়ার্ডে ভিডিপির দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন সদস্য। তাদের অভিযোগ, পৌরসভায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের দলনেতাদের পরিবর্তে উপজেলা পর্যায়ের একজন দলনেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পৌরসভার উচ্ছেদ অভিযানসহ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ভিডিপি সদস্যদের কেউ কেউ কয়েকদিন দায়িত্ব পালনের পর মাসের বাকি সময় নিয়মিত দায়িত্বে না থেকেও ভাতা বা সম্মানী গ্রহণ করছেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আত্মীয়দের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ একজন ভিডিপি সদস্য দাবি করেন, দলনেতা রহিমের আত্মীয়দের কেউ কেউ সময়মতো দায়িত্বে উপস্থিত না হলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ওই সদস্যের ভাষ্য, “আমি একদিন দেরিতে আসায় আমাকে বাদ দেওয়া হয়। পরে রহিমের বোনের জামাই মো. সানিকে ওই ডিউটিতে দেওয়া হয়। আমাকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে জেলা অফিস থেকে কোনো লিখিত চিঠিও দেওয়া হয়নি।”তিনি আরও দাবি করেন, বিষয়টি জানতে উপজেলা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে বলা হয়—“রহিম সাহেব যা বলে তাই।”
বেতন শিটে স্বাক্ষর না নেওয়ার অভিযোগ কয়েকজন ভিডিপি সদস্যের অভিযোগ, তাদের মাসিক বেতন বা সম্মানীর বেতন শিটে নিয়মিত স্বাক্ষর নেওয়া হয় না। এতে প্রকৃতপক্ষে কে কতদিন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কার নামে কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে—তা নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে তারা দাবি করেন। অভিযোগকারীদের মতে, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ডিউটি তালিকা, উপস্থিতি, বেতন শিট ও ভাতা প্রদানের তথ্য নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন।
কর্মকর্তার প্রশ্রয়ের অভিযোগ ভুক্তভোগীদের অভিযোগের তির শুধু দলনেতা রহিমের দিকে নয়; তার কর্মকাণ্ডে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা আবুল কাশেমের প্রশ্রয় রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।তাদের দাবি, মাঠপর্যায়ে কোনো অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ করলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দলনেতা রহিম আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। তবে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এসব অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা আবুল কাশেমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাধারণ আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের দাবি, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে জেলা বা উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। একই সঙ্গে ভিডিপি সদস্য অন্তর্ভুক্তি, ডিউটি বণ্টন, উপস্থিতি, বেতন-ভাতা এবং বিশেষ ডিউটির তালিকা যাচাই করে প্রকৃত অনিয়ম থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, সরকারি এই গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে মাঠপর্যায়ে শৃঙ্খলা ও জনআস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।