আজ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংবাদিক ও যশোরের কৃতি সন্তান এইচ এম জাফর আলীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।এক বছর আগে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে প্রাণ হারান রাজপথের এই সাহসী যোদ্ধা। ঢাকা থেকে নিজ বাড়ি যশোরে ফেরার পথে যশোরের বাঘারপাড়া এলাকায় ঘাতক সড়ক দুর্ঘটনায় তার জীবনাবসান ঘটে। তার আকস্মিক মৃত্যু শুধু পরিবারকেই নয়, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সাংবাদিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী এবং অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীকে গভীরভাবে শোকাহত করে।
জাফর আলীর মৃত্যুর সবচেয়ে নির্মম দিক হলো—তার স্ত্রী ও শিশু দুই সন্তান এক মুহূর্তে অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। যে মানুষটি সারাজীবন অন্যায়, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, সেই মানুষটির অনুপস্থিতিতে তার পরিবারকে আজও কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।এইচ এম জাফর আলী ছিলেন আপসহীন রাজনৈতিক কর্মী। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তাকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে পুলিশের হাতে অমানবিক নির্যাতনেরও শিকার হয়েছেন। দীর্ঘ সময় দলীয় পদ-পদবি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু পদ-পদবি না থাকলেও দলের প্রতি তার ভালোবাসা ও আনুগত্যে কখনো ভাটা পড়েনি।
বরং নিজের বঞ্চনার কষ্টকে পাশে সরিয়ে রেখে তিনি অন্য নেতাকর্মীদের সাহস জুগিয়েছেন। যারা বিভিন্ন সময়ে দলীয় পদ-পদবি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে জাফর আলী ছিলেন একজন নির্ভরতার মানুষ।তার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—পদ নয়, দলই বড়; ব্যক্তিস্বার্থ নয়, আদর্শই মুখ্য।দুঃসময়ে অনেকেই যখন নীরব হয়ে যান, তখন জাফর আলীকে দেখা যেত রাজপথে। মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার কিংবা নির্যাতন—কোনোটিই তাকে তার রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে সরাতে পারেনি।
বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। তিনি সংগঠনটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মানবাধিকার রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন।
সংগঠনের দুঃসময়ে ডাক দিলেই জাফর আলীকে পাওয়া যেত—এটি ছিল তার অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য। কোনো কর্মসূচিতে লোকসংখ্যা কত হবে, কে কী বলবে কিংবা তার ব্যক্তিগত লাভ কী—এসব হিসাব তিনি করতেন না। মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতেন।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদ, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং রাজপথের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার সরব উপস্থিতি তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছিল।
জাফর আলী ছিলেন একজন সাংবাদিক। সাংবাদিকতার পাশাপাশি রাজনীতি ও মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা তাকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
একজন সাংবাদিক হিসেবে তিনি সমাজের নানা অসঙ্গতি, নিপীড়ন ও অন্যায়ের বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। আর একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তিনি মাঠে থেকে মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করেছেন।
তার জীবন ছিল রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও মানবাধিকারের এক অনন্য সমন্বয়।এইচ এম জাফর আলীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল গভীর ও আত্মিক। তিনি শুধু রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন না, ছিলেন আমার অত্যন্ত প্রিয় ছোট ভাই।বেঁচে থাকা অবস্থায় প্রায়ই ফোন করতেন। আমার খোঁজখবর নিতেন। সংগঠনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। কখনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কখনো মানবাধিকার আন্দোলন, আবার কখনো ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা হতো।বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির কোনো কঠিন সময়ে তাকে ডাক দিলে তিনি পাশে এসে দাঁড়াতেন। সংগঠনের কর্মসূচি কিংবা রাজপথের কোনো আন্দোলনে তার উপস্থিতি আমাদের জন্য ছিল সাহস ও অনুপ্রেরণার।এখনো অনেক সময় মনে হয়, জাফর আলী হয়তো ফোন করবেন—
“ভাই, কেমন আছেন? কী খবর?”কিন্তু সেই ফোন আর আসে না।
একজন প্রিয় সহযোদ্ধার কণ্ঠ চিরতরে থেমে গেছে—এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন।সুদিনের অপেক্ষায় ছিলেন, কিন্তু দেখে যেতে পারলেন না
জাফর আলী তার প্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে ভালোবাসতেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন দেশে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক সুদিন ফিরে আসবে।
বহু নির্যাতন, কারাবরণ ও বঞ্চনার পরও তিনি আশাবাদী ছিলেন। বুকভরা সাহস নিয়ে অপেক্ষা করতেন সেই দিনের জন্য—যেদিন তার প্রিয় দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসবে এবং দেশের মানুষ একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা দেখতে পাবে।
দুঃখজনকভাবে সেই সুদিনের দ্বারপ্রান্তে এসে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।সুদিন এলো, কিন্তু জাফর আলী তা দেখে যেতে পারলেন না।
একটি ঘাতক সড়ক দুর্ঘটনা তার স্বপ্ন, আশা ও সম্ভাবনাকে অকালে থামিয়ে দিল।দলের কাছে পরিবারের জন্য মানবিক সহায়তার প্রত্যাশা
জাফর আলী সারাজীবন দল ও আদর্শের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
আজ তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার অসহায় স্ত্রী ও শিশু দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়।
আমার প্রত্যাশা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ প্রয়াত নেতা এইচ এম জাফর আলীর পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন। তার স্ত্রী ও শিশু সন্তানদের প্রতি মানবিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করবেন। একজন নিবেদিত নেতাকর্মীর পরিবারের পাশে দাঁড়ানো শুধু সহমর্মিতা নয়—এটি দলের প্রতি তার দীর্ঘ ত্যাগ ও অবদানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন।
মানুষ পৃথিবীতে চিরদিন বেঁচে থাকে না। কিন্তু কিছু মানুষ তাদের কর্ম, আদর্শ, সাহস ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন।
এইচ এম জাফর আলী ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।
রাজপথের সাহসী যোদ্ধা হিসেবে, মানবাধিকারকর্মী হিসেবে, সাংবাদিক হিসেবে এবং সর্বোপরি একজন নিবেদিত রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তিনি যে ভূমিকা রেখে গেছেন, তা তার সহযোদ্ধাদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন অম্লান থাকবে।আজ তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি প্রিয় ছোট ভাই এইচ এম জাফর আলীকে।
আল্লাহ তার সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন, কবরকে নূরে ভরে দিন এবং তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন।তার শোকসন্তপ্ত স্ত্রী, দুই শিশু সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।জাফর আলী নেই, কিন্তু তার সাহস, আদর্শ ও ভালোবাসা আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।