বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দুর্গম সীমান্তবর্তী দোছড়ি ইউনিয়নের কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ওপর একই পথে দুই ইউনিয়নে ট্যাক্স আদায়ের অভিযোগে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দোছড়ি ইউনিয়ন পরিষদে বৈধভাবে ট্যাক্স পরিশোধ করার পর কক্সবাজারের রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ইজারাদাররা একই পণ্যের ওপর আবারও ট্যাক্স আদায় করছেন। এতে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ন্যায্য মূল্য থেকেও বঞ্চিত হতে হচ্ছে।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে দোছড়ি ইউনিয়নের কয়েকজন বাসিন্দা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মাধ্যমে ২’আগস্ট বান্দরবান জেলা পরিষদ প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে তারা অবিলম্বে এ ধরনের দ্বৈত ট্যাক্স আদায় বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, দোছড়ি ইউনিয়ন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সর্বপূর্বের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা। যোগাযোগের প্রধান পথ রামু উপজেলার গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়া হয়ে। এখানকার অধিকাংশ মানুষ জুমচাষ, ফলের বাগান ও কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। আম, কলা, লেবু, পেঁপেসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা।
কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে হলে প্রথমে দোছড়ি ইউনিয়ন পরিষদে ট্যাক্স দিতে হয়। এরপর গর্জনিয়া বাজারে যাওয়ার পথে কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন পরিষদের টোলঘরে আবারও একই পণ্যের ওপর ট্যাক্স দিতে বাধ্য করা হয়। আপত্তি জানালে অনেক সময় পণ্যবাহী গাড়ি আটকে রাখা হয়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে যে রসিদ দেওয়া হয়, তাতেও আদায়কারীর নাম বা ইজারাদারের পরিচয় উল্লেখ থাকে না।
দোছড়ি ইউনিয়নের তুলাতলি এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোঃ ইসলাম বলেন,”আমরা পাহাড়ে কষ্ট করে ফসল ফলাই। বাজারে নিয়ে যাওয়ার আগেই বিভিন্ন জায়গায় ট্যাক্স দিতে দিতে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই উঠে আসে না। এভাবে কৃষক বাঁচবে কীভাবে?”স্থানীয় ফল ব্যবসায়ী মো. নুরুল ইসলাম বলেন,”একই পণ্যের ওপর বারবার ট্যাক্স দিতে হলে ব্যবসায়ীরা কেন দোছড়িতে যাবে? অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেকেই এখন ওই এলাকা থেকে পণ্য কিনতে চান না। এতে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি বাজার ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে।”গর্জনিয়া বাজারের আরেক ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন,
“দোছড়ির আম, লেবু ও কলার ভালো চাহিদা রয়েছে। কিন্তু পরিবহন ব্যয় ও অতিরিক্ত ট্যাক্সের কারণে অনেক ব্যবসায়ী এখন অন্য এলাকা থেকে পণ্য সংগ্রহ করছেন। এর প্রভাব সরাসরি কৃষকদের ওপর পড়ছে।”
স্থানীয় সমাজসেবকা ও শিক্ষিকা রায় ত্রিপুরা বলেন,”একটি পণ্যের ওপর যদি একাধিক প্রতিষ্ঠানে ট্যাক্স দিতে হয়, তাহলে সেটি শুধু কৃষকের প্রতি অন্যায় নয়, এটি বাজার ব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত তদন্ত করে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া।”
দোছড়ির বাসিন্দা গৃহিণী রহিমা বেগম বলেন,”আমাদের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস কৃষি। ফসল বিক্রি করে সংসার চলে। কিন্তু ট্যাক্স আর টোল দিতে দিতে কৃষকের ঘরে এখন হতাশা ছাড়া কিছু নেই।”
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দোছড়ি থেকে গর্জনিয়া বাজারের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। একটি কলার ছড়া পরিবহনে প্রায় ৪০ টাকা এবং প্রতি বস্তা কৃষিপণ্য পরিবহনে প্রায় ১৫০ টাকা ভাড়া গুনতে হয়। এর সঙ্গে একাধিক ট্যাক্স ও নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করায় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বান্দরবান জেলা পরিষদ, দোছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ এবং পরে কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন পরিষদ—তিন ধাপে বিভিন্ন নামে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ফলে বাইরের ব্যবসায়ীরাও দোছড়ি এলাকায় যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। চলতি মৌসুমে আম, পেঁপে ও লেবুর বাম্পার ফলন হলেও পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় অনেক কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগে একটি উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, কক্সবাজার সদরে যে আমের বাজারদর কেজিপ্রতি প্রায় ৪০ টাকা, অতিরিক্ত ট্যাক্সের কারণে ব্যবসায়ীরা দোছড়ি এলাকায় গিয়ে সেই আম কিনতে কেজিপ্রতি মাত্র ১০ টাকা দাম প্রস্তাব করছেন। এতে কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কৃষকের ঘামঝরা ফসল বাজারে পৌঁছানোর আগেই যদি একাধিক স্থানে ট্যাক্সের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কৃষিকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তারা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে অবৈধ বা দ্বৈত ট্যাক্স আদায় বন্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তবে এ বিষয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাসান বলেন,দ্বৈত ট্যাক্স বন্ধে কার্যকর ব্যবস্হা গ্রহনের দাবী জানিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন দোছড়ি ইউনিয়নের কয়েকজন কৃষক। অভিযোগ টি ইতোমধ্যে বান্দরবান জেলা পরিষদ প্রশাসক বরাবর প্রেরণ করা হবে।