বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দুর্গম বাইশারী এলাকায় সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার পিএইচপি মোড় থেকে বাইশারী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নকাজের বিভিন্ন স্থানে ভারী যন্ত্র দিয়ে পাহাড়ের অংশবিশেষ কেটে ফেলার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, সড়ক প্রশস্ত করার কথা বলে পাহাড় কেটে সেই মাটি বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী অন্তত অর্ধশত পরিবার ভূমিধসের ঝুঁকিতে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড় কাটার ফলে কোথাও কোথাও বসতবাড়ির সীমানাপ্রাচীরের পাশ থেকে ৭–৮ ফুট পর্যন্ত মাটি সরে গেছে। কয়েকটি স্থানে পাহাড়ের উচ্চতা ৮–১০ ফুট পর্যন্ত বলে দাবি তাঁদের। বর্ষায় ভারী বৃষ্টিপাত হলে এসব স্থান ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
যেভাবে কাটা হচ্ছে পাহাড় সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাইশারীর দক্ষিণ বাইশারী কাঞ্চাশিয়া এলাকায় সড়ক সম্প্রসারণের কাজের অংশ হিসেবে পাহাড়ের ঢাল কাটার কাজ হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভারী এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কোথাও ডাম্পার ও ট্রাক্টর, কোথাও পিকআপে করে মাটি অন্যত্র নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, সড়ক সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার তুলনায় কিছু জায়গায় বেশি পরিমাণ পাহাড় কাটা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সড়ক উন্নয়নের কাজের পাশাপাশি কাটা মাটি বিক্রিরও একটি বাণিজ্যিক তৎপরতা চলছে।
অর্ধশত পরিবারে আতঙ্ক:পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী অন্তত ৫০টি পরিবার এখন ঝুঁকিতে রয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি। তাঁদের আশঙ্কা, বর্ষায় টানা বৃষ্টি হলে কেটে ফেলা পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসে পড়তে পারে। এতে বসতঘর, সীমানাপ্রাচীর, সড়ক ও আশপাশের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির আশঙ্কাও রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রশিদ বলেন, “সড়ক উন্নয়নের নামে যেভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বড় বিপদের কারণ হতে পারে।”
দক্ষিণ বাইশারীর বাসিন্দা নার্গিস জাহানের অভিযোগ, তাঁর বসতবাড়ির সীমানাপ্রাচীরের পাশে পাহাড় কাটার কারণে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে চলাচলের পথও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে চলাচলের ব্যবস্থা এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ইউএনও ঘটনাস্থল পরিদর্শন:পাহাড় কাটার অভিযোগের বিষয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এনামুল হাসান জানান, বিষয়টি জানার পর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সভাপতি ছিদ্দিকুর রহমান এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
ইউএনওর নির্দেশনায় কেটে ফেলা পাহাড়ের পাদদেশে সড়কের দুই পাশে গাইড ওয়াল নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।এর উদ্দেশ্য ঝুঁকিতে থাকা বসতবাড়ি ও সীমানাপ্রাচীরকে নিরাপদ করা।
প্রকল্পের অর্থ ছাড় নিয়েও প্রশ্ন:অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে সড়ক সংস্কারের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক সংস্কারের নামে পাহাড় কাটার বিষয়টি সামনে আসার পর প্রকল্পের প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড় হলেও পরবর্তী অর্থ ছাড় দেওয়া হয়নি।
লিখিত অভিযোগ, বন বিভাগের উদ্বেগ:
পাহাড় কাটার অভিযোগে গত ১ জুলাই নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন পাহাড়ে বসবাসরত বাসিন্দাদের পক্ষে নার্গিস জাহান। অভিযোগের অনুলিপি বান্দরবান জেলা পরিষদ প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ সুপার ও নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছেও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগে দক্ষিণ বাইশারী কাঞ্চাশিয়া এলাকায় রাস্তা সম্প্রসারণের নামে পাহাড় কাটার বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এদিকে পাহাড় কাটার কারণে বন বিভাগের একটি কার্যালয়, গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
সাঙ্গু বন রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা তানবির খলিল চৌধুরী বলেন, বিষয়টি তিনি নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। এ বিষয়ে লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
পরিবেশ আইনের প্রশ্ন:পাহাড় কাটা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঢাল কেটে ফেলা হলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচে নেমে মাটি ক্ষয়ের মাত্রা বাড়তে পারে। এতে ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশে বসতবাড়ি গুলোর ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
তাই সড়ক উন্নয়নের জন্য যতটুকু পাহাড় কাটা প্রয়োজন, প্রকল্পের নকশা ও অনুমোদন অনুযায়ী ঠিক ততটুকুই কাটা হয়েছে কি না—তা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ প্রত্যাহারে চাপ দেওয়ার অভিযোগ:পাহাড় কাটায় প্রতিকার চেয়ে অভিযোগকারী নার্গিস জাহান কে ভয়ভীতি দেখিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহারের চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঠিকাদার ছিদ্দিকুর রহমান ও তাঁর লোকজন অভিযোগকারী এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র: বাইশারীর এই ঘটনায় মূল প্রশ্ন হলো—সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদিত নকশায় ঠিক কতটুকু পাহাড় কাটার কথা ছিল, বাস্তবে কতটুকু কাটা হয়েছে এবং কাটা মাটি কোথায় নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাটি বিক্রির অভিযোগের সত্যতা, পরিবেশগত ছাড়পত্র বা সংশ্লিষ্ট অনুমোদন এবং প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বর্ষার মধ্যে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা প্রবল। তাঁরা প্রশাসন, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টরা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডিজিএফআই, এনএসআইসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপও দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের অজুহাতে পরিবেশগত বিধিবিধান না মেনে পাহাড় কর্তনের মতো জঘন্য কাজে জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবী জানান। পাশাপাশি পাহাড় কাটায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া দাবী জানান।