সীমান্তঘেঁষা নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের একমাত্র সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। হাসপাতালটির মঞ্জুরিকৃত ২০৬টি পদের মধ্যে ৯২টিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ৩৩টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৪ জন। এর মধ্যে দুজন অন্য প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে দায়িত্ব পালন করায় হাসপাতালে কার্যত চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন মাত্র ১২ জন।
জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারও বছরের পর বছর ধরে কার্যত বন্ধ। অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও চিকিৎসক, অ্যানেসথেসিয়া-সংশ্লিষ্ট জনবল ও সহায়ক কর্মীর অভাবে সেখানে কোনো অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দুর্ঘটনায় আহত, হাড়ভাঙা ও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হওয়া রোগীদের নীলফামারী জেনারেল হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।
প্রাপ্ত জনবল তালিকা অনুযায়ী, ২০৬টি মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১১৪ জন। শূন্য রয়েছে ৯২টি পদ। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএন্ডএফপিও) পদটিও শূন্য। অন্যদিকে আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) পদে স্থায়ী কর্মকর্তা থাকলেও একজন মেডিকেল অফিসার ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শূন্য রয়েছে হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল অফিসারের পদ।
চিকিৎসকের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ৯টি পদই শূন্য। স্বাস্থ্য পরিদর্শকের তিনটি পদের বিপরীতেও নেই কোনো জনবল। স্বাস্থ্য সহকারীর ৪৫টি পদের মধ্যে ২১টি এবং অফিস সহায়কের পাঁচটি পদের মধ্যে চারটি পদ শূন্য রয়েছে।
সম্প্রতি অর্থোপেডিক জুনিয়র কনসালটেন্ট পদোন্নতি পাওয়ায় ওই পদেও নতুন করে শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে উপজেলার অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ সেবাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
জনবল সংকটে অচল অপারেশন থিয়েটার হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রস্তুত থাকলেও জনবলের অভাবে সেখানে অস্ত্রোপচার হচ্ছে না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত, হাড়ভাঙা কিংবা জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হওয়া রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।
এতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
হাসপাতালের একাধিক মেডিকেল অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চাহিদার তুলনায় চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল অনেক কম। প্রতিদিন অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। সীমিত জনবল দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত শূন্য পদ পূরণ করা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অনেক রোগীকেই বাইরে রেফার করা হয়। এতে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, সময় নষ্ট হয় এবং দরিদ্র পরিবারগুলোকে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকটের কারণেও হাসপাতালের পরিবেশ সবসময় কাঙ্ক্ষিত মানে রাখা সম্ভব হয় না।
ঠাকুরগঞ্জ ঈদগাহ মাঠ এলাকার বাসিন্দা মোছা. নাছিমা বেগম তাঁর সাত বছরের মেয়ে উম্মে হাবিবাকে পেটব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। তিনি বলেন, গরিব মানুষ সরকারি হাসপাতালে আসে খরচ বাঁচাতে। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে বাইরে যেতে হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসায় হাজার হাজার টাকা খরচ হয়। যা আমাদের মতো পরিবারের পক্ষে বহন করা খুবই কষ্টকর।
এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, জনবল পূরণের জন্য সরকার থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছিল। আমরা প্রয়োজনীয় তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি। সরকার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। আশা করছি, শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও জনবল সংকটে এর পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না উপজেলার মানুষ। দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ এবং বন্ধ থাকা অপারেশন থিয়েটার চালুর কার্যকর উদ্যোগ চান স্থানীয়রা।