কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়ন পরিষদে বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন সেবাগ্রহীতার পোস্ট এবং ইউনিয়ন পরিষদের এক উদ্যোক্তার বক্তব্য সম্বলিত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এখানে বিভিন্ন সনদ ও প্রশাসনিক সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রসিদ দেওয়া হয় না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদে নাগরিক সনদ, ওয়ারিশ সনদ, প্রত্যয়নপত্র এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সংক্রান্ত সেবা নিতে গেলে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত ১৫০ টাকা দাবি করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), ইউনিয়ন পরিষদ সচিব এবং তথ্য সেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তার নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।
এদিকে, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সরকারি ফি নিয়ে বিদ্যমান বিধিমালার সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের অমিলের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, *জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিধিমালা, ২০১৭*-এর বিধি ২৩-এর উপবিধি (৭)-এর ক্ষমতাবলে সরকার জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ফি নির্ধারণ করেছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, জন্ম বা মৃত্যুর ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) দিনের মধ্যে কোনো ব্যক্তির জন্ম বা মৃত্যু নিবন্ধন সম্পূর্ণ বিনা ফিতে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে, জন্ম বা মৃত্যুর ৪৫ দিনের পর থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে জন্ম বা মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য সাকুল্যে ২৫ টাকা ফি প্রযোজ্য। আর জন্ম বা মৃত্যুর ৫ বছরের বেশি সময় অতিক্রম করার পর নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সাকুল্যে ৫০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া জন্ম তারিখ সংশোধনের আবেদন ফি ১০০ টাকা এবং জন্ম তারিখ ছাড়া নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, ঠিকানা কিংবা অন্যান্য তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন ফি ৫০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার।
একই বিধিমালায় বলা হয়েছে, বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় মূল সনদ অথবা তথ্য সংশোধনের পর নতুন সনদের কপি বিনা ফিতে সরবরাহ করা হবে। তবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় সনদের নকল সরবরাহের ক্ষেত্রে ৫০ টাকা ফি প্রযোজ্য হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সরকারি নির্ধারিত ফি থাকা সত্ত্বেও হারবাং ইউনিয়ন পরিষদে বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে, যা সরকারি বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
একই সঙ্গে, প্রতি বছর আদায়কৃত হোল্ডিং বা চৌকিদারী করের আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, প্রতি বছর ইউনিয়ন থেকে মোটা অঙ্কের কর আদায় করা হলেও তা যথাযথভাবে সরকারি হিসাবভুক্ত হচ্ছে কিনা এবং কোন কোন উন্নয়ন খাতে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে জনগণকে অবহিত করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।
স্থানীয় সরকার আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ কেবল সরকার নির্ধারিত ফি ও কর বিধিমালা অনুযায়ী অর্থ আদায় করতে পারে। একই সঙ্গে আদায়কৃত অর্থের বিপরীতে সরকারি রসিদ প্রদান এবং তা নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা করা বাধ্যতামূলক। তবে হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে এই প্রশাসনিক নিয়ম লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় সচেতন মহলের।
উন্মুক্ত বাজেট সভা কিংবা ওয়ার্ড সভার মাধ্যমে পরিষদের আর্থিক কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে প্রকাশ করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধছে।
অভিযোগের সার্বিক বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের ডিজিটাল উদ্যোক্তা জুবায়ের বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি ভূয়া। আমরা নিয়মের বাইরে কোনো টাকা নিই না। সেবাগ্রহীতারা অনেক সময় কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও চা-নাস্তার খরচ বাবদ কিছু টাকা স্বেচ্ছায় দেন। তবে কোনো কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের বিষয়টি সত্য নয়।”
হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোজাহের আহমদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এমন অভিযোগ সত্য নয়। যারা এসব বলছে, তারা আমার নামে এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তার নামে বদনাম রটাচ্ছে। আমরা হারবাং ইউনিয়নে যেভাবে সেবা দিচ্ছি, সেভাবে বাংলাদেশের অন্য কোনো ইউনিয়নে সেবা দেওয়া হচ্ছে না। এলাকার বিএনপির কিছু চ্যাছড়া লোকজন আমাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ধান্দায় এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, একটি ভিডিওতে ডিজিটাল উদ্যোক্তাকে বলতে শোনা যায় যে, ‘৫০ টাকা আপনার নামে, ৫০ টাকা ইউএনওর নামে এবং ৫০ টাকা ডিজিটাল উদ্যোক্তার নামে নেওয়া হচ্ছে’ এমন একটি স্বীকারোক্তি রয়েছে। এ প্রসঙ্গে কী বলবেন?
জবাবে তিনি রাগান্বিত হয়ে বলেন, “এসব আউল-ফাউল প্রশ্ন করার জন্য আমাকে ফোন দিয়েছেন নাকি? ভালো কথা বলার জন্য ফোন দেবেন আমাকে। আপনি ফোন কাটেন, আমি কাজ করছি।” এ কথা বলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শাহীন দেলোয়ার এ প্রসঙ্গে বলেন, “এই প্রসঙ্গে আমি কিছু জানি না। এমন কোনো অভিযোগ আমার নলেজে নেই। হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি নাগরিক সেবার সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে এক পয়সাও নিয়ে থাকে, তা যদি বিন্দুমাত্র প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি উপজেলা অফিসে দায়িত্ব পালন করি। নাগরিক সেবার কোনো বিষয় যদি আমার অফিসে আসে, তাহলে আমি তা যাচাই-বাছাই করে স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করে দিই।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ইউনিয়ন পরিষদ হলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এই স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ব্যাহত হতে পারে।
হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক কর্মকাণ্ডে শতভাগ স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং আদায়কৃত অর্থের সঠিক হিসাব নিশ্চিত করতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।