ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাধুহাটী গ্রামের পথে হাঁটলেই চোখে পড়ে পাটচাষিদের ব্যস্ততা। নবগঙ্গা নদীতে পাট জাগ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও পানিতে ডুবিয়ে রাখা পাট থেকে আঁশ ছাড়ানো হচ্ছে, আবার কোথাও নারী-পুরুষ মিলে পাটের আঁশ শুকিয়ে বাজারজাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বছরের পর বছর ধরে পাটকে ঘিরেই এই গ্রামের বহু কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকা। বর্ষার পানিতে নবগঙ্গা নদী, খাল-বিল ও নিচু জমি ভরে উঠলে শুরু হয় পাট জাগ দেওয়ার কাজ। কৃষকেরা কেটে আনা পাট আঁটি বেঁধে পানিতে ডুবিয়ে রাখেন। ১৬ থেকে ২১ দিন পর পচন ধরলে শুরু হয় আঁশ ছাড়ানোর কঠিন কাজ। নারী পুরুষ কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে আবার কেউ বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাটের আঁশ ছাড়ান। এরপর পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হয় বাজারজাতের উপযোগী পাট।
ছবিতে সাধুহাটী গ্রামের কয়েকজন কৃষক নবগঙ্গা নদীতে তীরে বসে পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছেন। তীরের পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে শুকানোর অপেক্ষায় থাকা পাট। তাদের পরিশ্রমের প্রতিটি মুহূর্ত যেন গ্রামীণ অর্থনীতির এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। শুধু পুরুষরাই নন, পাট প্রক্রিয়াজাতকরণে নারীদেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। গ্রামের নারীরা পাটের আঁশ বাছাই, গোছানো ও শুকানোর কাজে পরিবারের পুরুষদের সহযোগিতা করেন। ঘর-সংসারের কাজের পাশাপাশি পাটের সঙ্গে যুক্ত থেকে পরিবারের আয়ে অবদান রাখছেন এই গ্রামের নারীরা। দাম ও খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা পাট চাষে কৃষকের পরিশ্রম যেমন বেশি, তেমনি রয়েছে নানা ধরনের খরচ, বীজ, জমি প্রস্তুত, শ্রমিকের মজুরি, আগাছা পরিষ্কার, পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানো—প্রতিটি ধাপেই অর্থ ব্যয় হয়। ফলে উৎপাদনের পর কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে কৃষকের লাভ অনেকটাই কমে যায়।কৃষকরা পাট চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সাধুহাটী গ্রামের পাটচাষিদের জীবন তাই একদিকে ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার, অন্যদিকে অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামের। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পানির সংকট কিংবা বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ার মতো সমস্যাগুলো তাদের চিন্তায় রাখে।
কিন্তু এ বছর পাটের দাম অনেক বেশি। এলাকার বিভিন্ন বাজারে প্রতি মণ পাট ৩৮০০ টাকা থেকে ৪২০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে । ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা মহা খুশি । এলাকায় চায়ের দোকানে কৃষকেরা তাদের সফলতার গল্প তুলে ধরছেন। সাধুহাটীর কৃষকদের ঘাম, শ্রম আর অপেক্ষার পর যখন পাটের আঁশ শুকিয়ে সোনালি রূপ নেয়, তখন তাদের চোখে ফুটে ওঠে নতুন আশার আলো।
একই সঙ্গে পাট জাগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পানি, উন্নতমানের বীজ, কৃষি পরামর্শ এবং সহজে বাজারজাত করার সুযোগ ভবিষ্যতে নিশ্চিত হলে তারা আরও উৎসাহিত হবেন। ঝিনাইদহের সাধুহাটী গ্রামে নদীতে পাটের আঁশ ছাড়াতে থাকা কৃষকদের দৃশ্য তাই শুধু একটি গ্রামের চিত্র নয়; এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষিজীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। কৃষকের হাতে পাটের আঁশ, কপালে ঘাম আর চোখে ন্যায্য মূল্যের প্রত্যাশাএই শ্রমের মূল্যায়নই হতে পারে পাটচাষিদের জীবনে স্বস্তির নতুন পথ।