রাজশাহীতে রেকর্ড পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও বাজারে নজিরবিহীন দরপতনে চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় হাজারো চাষি লোকসানের মুখে পড়েছেন। সংরক্ষণে পচন, ওজন কমে যাওয়া এবং বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে কৃষকদের হতাশা দিন দিন বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে আগামজাত বা মুড়িকাটা পেঁয়াজ। চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৪ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি মুড়িকাটা পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ টন। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে তাহেরপুরী ও নাসিক এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
তবে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকদের মুখে নেই স্বস্তির হাসি। স্থানীয় চাষিদের অভিযোগ, অন্যান্য বছর এ সময়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে জাতভেদে দাম নেমে এসেছে মাত্র ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। ফলে গত বছরের তুলনায় প্রতি মণে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত কম দাম পাচ্ছেন তারা।
কৃষকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ঘরে সংরক্ষণ করে রাখার কারণে অনেক পেঁয়াজ শুকিয়ে ওজন হারাচ্ছে, আবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেঁয়াজ পচেও নষ্ট হচ্ছে। এর সঙ্গে বাজারে ওজন সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় তোলা এখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুঠিয়ার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর হাটে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক আব্দুল মমিন বলেন, “এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন মাত্র এক কেজি গরুর মাংস কেনা যায়। সংসারের প্রয়োজনীয় সবজি কিনতেও আরও এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়। গত ২০ বছরে এমন দাম দেখিনি।”
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, অতিরিক্ত উৎপাদন ও সংরক্ষণ সংকটের কারণেই বাজারে এই দরপতন দেখা দিয়েছে। পেঁয়াজ ব্যবসায়ী খায়রুল ইসলাম জানান, “এবার উৎপাদন অনেক বেশি হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকরা একসঙ্গে বাজারে পেঁয়াজ নিয়ে আসছেন। মোকামে বেশি দামে বিক্রি করতে না পারলে আমরা বেশি দামে কিনব কীভাবে?”
পবা উপজেলার কৃষক শুকুর মোহম্মদ বলেন, “গত বছর পেঁয়াজ চাষে কিছু লাভ হয়েছিল। কিন্তু এবার ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাজারে কোনো দাম নেই, কী করবো বুঝতে পারছি না।”কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, নিজস্ব জমিতে প্রতি বিঘা পেঁয়াজ চাষে খরচ হয় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। আর লিজ নেওয়া জমিতে এ খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকায়। এর মধ্যে শুধু জমির ভাড়াই বিঘাপ্রতি প্রায় ৩৫ হাজার টাকা।
চাষিদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতে দেশীয় মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে ওঠার সময় আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারে প্রবেশ করায় স্থানীয় উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।পুঠিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্মৃতি রানী সরকার বলেন, “বর্তমানে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমেছে। অনেক কৃষক পচনের আশঙ্কায় দ্রুত বিক্রি করছেন। অতিরিক্ত জোনের কারণেই এই দরপতন। তবে কিছুদিন পর বাজারদর বাড়তে পারে বলে আশা করছি।”
এদিকে কৃষকদের দাবি, বাজার নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন, যা ভবিষ্যতে উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থায় নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পরিচর্যা শাখার পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, “পেঁয়াজ সারা বছর ব্যবহৃত হলেও সবাই যদি একসঙ্গে বিক্রি করতে যায়, তাহলে বাজারদর কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাই ফসল তোলার পরপরই উৎপাদন খরচ উঠে আসবে—এমন প্রত্যাশা সবসময় বাস্তবসম্মত নয়।”