লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় বিদ্যুতের দাবিতে স্থানীয়দের সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের জেরে নিউজ২৪ টেলিভিশনের লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি রবিউল হাসানকে এক নম্বর আসামি করে মামলা দায়েরের অভিযোগ উঠেছে বড়খাতা নেসকো বিভাগের প্রকৌশলী রেজওয়ান হোসেনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ উঠেছে, সংবাদ সংগ্রহের ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা মামলাটি কোনো ধরনের প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই নথিভুক্ত করে আদালতে পাঠায় হাতীবান্ধা থানা পুলিশ। এ ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সাংবাদিককে গুরুতর মামলায় আসামি করার ঘটনায় স্বাধীন সাংবাদিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জানা যায় গত ১৭ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে হাতীবান্ধা উপজেলার ফকিরপাড়া জোড়াপুকুর এলাকায় টানা তিন দিন বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা বিদ্যুতের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। খবর পেয়ে সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে যান নিউজ২৪-এর লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি রবিউল হাসান। তিনি বিক্ষোভের ভিডিও ধারণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভাগের গাড়িচালক ও বড়খাতা নেসকো বিভাগের প্রকৌশলী রেজওয়ান হোসেনের বক্তব্যও ধারণ করেন বলে জানান।
এর প্রায় ২০ দিন পর, গত ১৩ জুন প্রকৌশলী রেজওয়ান হোসেন বাদী হয়ে হাতীবান্ধা থানায় মামলা করেন। মামলায় রবিউল হাসানকে এক নম্বর আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে বেআইনি জনতায় দলবদ্ধ হওয়া, বিদ্যুৎকর্মীদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক ও গালিগালাজ, সরকারি কাজে বাধা, বিদ্যুৎ বিভাগের গাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা, কর্মীদের মারধর, টাকা ছিনিয়ে নেওয়া, গাড়ি ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের চেষ্টার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন সাংবাদিক রবিউল হাসান। তাঁর দাবি, ঘটনার সময় তিনি শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালন করে সংবাদ সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণ করছিলেন।
রবিউল হাসান বলেন, “ফকিরপাড়া জোড়াপুকুরে বিদ্যুতের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করি। বিদ্যুৎ বিভাগের গাড়ির চালক ও বড়খাতা প্রকৌশলী রেজওয়ান হোসেনের বক্তব্য ধারণ করি। কিন্তু অদৃশ্য কারণে আমার নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।”
মামলার বাদী নেসকোর প্রকৌশলী রেজওয়ান হোসেন বলেন, “উনি আসলে উসকানি দিয়ে করিয়েছেন। পুরো ঘটনা আমার জানা নেই। সংবাদ সংগ্রহ করা তাঁর মুখ্য বিষয় ছিল না- উনি উসকানি দিয়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। এ কারণে আমরা বিচার প্রত্যাশা করি।”
এদিকে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে মামলাটি নথিভুক্তের প্রক্রিয়া নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিক রবিউলের বিরুদ্ধে আনা গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে কোনো ধরনের প্রাথমিক তদন্ত না করেই মামলাটি রেকর্ডভুক্ত করে আদালতে পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে তৎকালীন হাতীবান্ধা থানার ওসি এবং বর্তমানে জেলা ডিবি কার্যালয়ে কর্মরত রমজান আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এজাহারে সংবাদকর্মী লেখা নাই। উনি জড়িত আছেন কি না, সেটা তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে।”
ওসির এই বক্তব্যেই নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- যদি তদন্ত করেই নির্ধারণ করতে হয় সাংবাদিক রবিউল ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি নথিভুক্ত করার আগে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়েছিল কি না?
এতে সাংবাদিক সমাজের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, একজন সাংবাদিক কোনো ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি সেই ঘটনারই প্রধান আসামি হয়ে যান, তাহলে মাঠপর্যায়ে স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করা কতটা নিরাপদ? তিনি কেবল সংবাদ সংগ্রহের কারণে মামলার আসামি হয়েছেন- তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি। মামলার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করার পাশাপাশি সাংবাদিক রবিউল হাসানকে হয়রানি করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।