চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়রের মেয়াদ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। নিজের মেয়াদের বৈধতার পক্ষে আদালতের রায়ের বিষয়টি সামনে এনে তিনি বলেছেন, ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর শপথ নেওয়ার পর তাঁর মেয়াদ স্বাভাবিকভাবেই ২০২৯ সাল পর্যন্ত। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে তাতে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।নগরের লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে চসিক মেয়রের মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
সমাবেশে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে একজন মেয়র আছে, উনার মেয়াদ কি এখনো আছে? উনাকে কী বলব আমরা? মেয়াদউত্তীর্ণ মেয়র, তাই না? এখন শুনি যে উনি যতদিন ইচ্ছা ততদিন থাকবেন। এর নাম সুশাসন, না এর নাম ফ্যাসিবাদ? আপনি আবার নির্বাচিত হয়ে আসেন। জনগণের ভোটে এসে সম্মানের সাথে আপনি নেতৃত্ব দেন, আমাদের কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু ভোটে যদি জনগণ অন্য কাউকে নির্বাচিত করে, তাও আপনাকে মেনে নিতে হবে।’ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্যের পর নিজের অবস্থান তুলে ধরে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, তাঁর মেয়র পদে দায়িত্ব পাওয়া কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায়ের ভিত্তিতেই তিনি দায়িত্ব পেয়েছেন।
গত রাতে আজাদীকে দেওয়া বক্তব্যে শাহাদাত বলেন, ‘আমি মনে করি যে, এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী এবং ফ্যাসিস্ট কায়দায় ২০২১ সালে নির্বাচিত রেজাউল করিমকে বৈধ মেয়র হিসেবে ওনার (জামায়াত আমির) সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। এই কথার মাধ্যমে উনি আওয়ামী লীগের ফ্যাসিজমকে অনেকটা সাপোর্ট করে গেছেন।’
লংমার্চ প্রসঙ্গেও প্রতিক্রিয়া জানান চসিক মেয়র। তিনি বলেন, ‘আজকে আমরা একটা লং ড্রাইভ দেখেছি। এটাকে আমি লং মার্চ বলব না, একটা লং ড্রাইভ বলব। এবং যেখানে তারা বলছে—বিদ্যুৎ দে, পানি দে, গ্যাস দে, নইলে গদি ছেড়ে দে। এত গ্যাস, ফুয়েল তারা ব্যয় করে আজকে একটা লং ড্রাইভ করেছে। তো সেখানে ঠিক আছে, তারা করেছে, তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি তারা করতে পারে।’
এরপর নিজের মেয়াদের প্রশ্নে সরাসরি অবস্থান তুলে ধরে শাহাদাত বলেন, ‘জামায়াতের সম্মানিত আমীর শফিকুর রহমান সাহেব মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়রের কথা বলেছেন আমাকে। আমি বলতে চাই, আমার এই রাইটটি ফ্যাসিবাদী রাজত্ব যারা ১৬ বছর কায়েম করেছে—হাসিনা সরকার, জোর করে আমার রাইটটাকে ছিনিয়ে নিয়ে যিনি অবৈধভাবে মেয়র হয়েছিলেন রেজাউল করিম, সেই রায়ের বিরুদ্ধে আমি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করি।’
তিনি দাবি করেন, আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই তাঁকে মেয়র হিসেবে বৈধ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে এবং পরে তিনি শপথ নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি আদালতের রায়েই কিন্তু বৈধভাবে আমাকে মেয়র হিসেবে তারা প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এবং আমি শপথ নিয়েছি। এবং রাইটটি হয়েছে ৫ আগস্টের পরে, ইন্টেরিম গভর্মেন্টের সময়।’
নিজের আইনি লড়াইয়ের প্রসঙ্গ টেনে শাহাদাত বলেন, জনগণের প্রত্যাশিত রায়ের জন্য তাঁকে দীর্ঘ সময় সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জনগণের যে প্রত্যাশিত রায়, যেটার জন্য ৩ বছর ধরে আমি ফাইট করেছি, যে মামলাটি করার জন্য ৬ মাস ধরে আমাকে জেলে থাকতে হয়েছে এবং বারবার আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা, গায়েবি মামলা দেওয়া হয়েছে। গত ১৬ বছরে আমার বিরুদ্ধে প্রায় ১১০টির উপরে মামলা।’
মেয়র আরও বলেন, ‘রায়ে স্পষ্ট বলা আছে যে, আওয়ামী লীগের যে মেয়র ছিল সে অবৈধ এবং তার টেনিওর যেটা ছিল সেটাও অবৈধ। কাজেই আমার যে মেয়াদ ২০২৪ সাল, সেই ২০২৪ সালের নভেম্বরের ৩ তারিখ আমি শপথ নিয়েছি, সেখান থেকে স্বাভাবিকভাবেই ২০২৯ সাল পর্যন্ত আমার মেয়াদ থাকবে।’
তবে মেয়রের বক্তব্যে শুধু মেয়াদের বৈধতার ব্যাখ্যাই নয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও তাঁর অবস্থান উঠে এসেছে। শাহাদাত বলেন, নির্বাচন হলে তিনি তা এড়িয়ে যেতে চান না; বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পক্ষে তিনি।তিনি বলেন, ‘জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য আমি কিন্তু বারবার বলে এসেছি যে, যখনই চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেই নির্বাচন করার জন্য আমি প্রস্তুত আছি।’
শাহাদাত আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমার বক্তব্য আপনারা সব জায়গায় দেখেছেন, আমি বলেছি যে সবারই অধিকার আছে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার এবং আমরা সবাই মিলেই একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন আমরা করতে চাই।’এদিকে, সর্বশেষ বক্তব্যে শাহাদাত আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলে তিনি মেয়রের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে প্রস্তুত। তাঁর ভাষ্য, এমন নির্বাচনকে তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্বাগত জানাবেন।
ফলে চসিক মেয়রের মেয়াদ নিয়ে নতুন করে যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেখানে একদিকে জামায়াত আমিরের প্রশ্ন—অন্যদিকে আদালতের রায়, নিজের শপথ এবং নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা সামনে এনে শাহাদাতের অবস্থান—দুই পক্ষের বক্তব্যই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।