এক সময় যার ক্ষণিক পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠত রাজপথ, যার একটি বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি করত ব্যাপক আলোড়ন, যিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রভাবশালী ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব—সেই বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া আজ জীবনের কঠিনতম সময় পার করছেন নিঃশব্দ, নিথর ও একাকী।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাসভবনে শয্যাশায়ী। শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। জীবনের এই কঠিন সময়ে তাঁকে আরও নিঃসঙ্গ করে দিয়ে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী, যিনি ছিলেন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি, সাহস ও অবলম্বন। প্রিয় জীবনসঙ্গীর মৃত্যু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির একজন অভিজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান ও সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে সুপরিচিত। কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করলেও রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুর-পল্লবী অঞ্চলের মানুষের অধিকার, উন্নয়ন ও কল্যাণে তিনি দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে নির্যাতিত নন-বাঙালি জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় তাঁর মানবিক অবস্থান আজও অনেকের কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের আমলে তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি উন্নয়ন, শিক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব, মেধা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা তাঁকে শুধু বিএনপির নয়, দেশের রাজনীতিতেও একটি বিশেষ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর দুঃসময়ে যখন অনেকেই বিভিন্ন কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন, তখন ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক নির্যাতন ও প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি দলের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর সাহসী নেতৃত্ব এবং কর্মীদের প্রতি আন্তরিকতা তাঁকে একজন অভিভাবকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর তেজগাঁও থেকে সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ আটজন গুম হওয়ার পর তিনি দ্রুত তাঁদের পরিবারের পাশে ছুটে যান। শোকাহত পরিবারকে সাহস জুগিয়েছেন এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছিলেন। সেই মানবিক উপস্থিতি গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। বর্তমানে সেই পরিবারের সদস্য প্রকৌশলী সানজিদা ইসলাম তুলি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হতে থাকে। মেরুদণ্ডের জটিল সমস্যাসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ধীরে ধীরে জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এক সময় যিনি হাজারো মানুষের আশা-ভরসার প্রতীক ছিলেন, আজ তিনি নিজেই সবার দোয়া ও ভালোবাসার প্রত্যাশী।
রাজনীতি মানুষের জন্য—এই বিশ্বাস তিনি আজীবন ধারণ করেছেন। ক্ষমতায় থাকুন কিংবা বিরোধী দলে, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শন। তাঁর সততা, দেশপ্রেম, গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার এবং আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থান তাঁকে দেশের রাজনীতিতে একটি সম্মানজনক আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
আজ সময়ের নির্মম বাস্তবতায় তিনি অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করছেন। দল-মত নির্বিশেষে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অবদান, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করে দেশবাসীর উচিত তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করা।
আমাদের সবার প্রিয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অবশ্যই তাঁকে দেখতে হাসপাতালে যাবেন এবং চিকিৎসার খোঁজ খবর নিবেন।
আমরা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে আন্তরিকভাবে দোয়া করি—তিনি যেন ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে পূর্ণ শেফা দান করেন, তাঁর সব কষ্ট লাঘব করেন এবং দ্রুত সুস্থ করে আবার পরিবারের সদস্য, শুভাকাঙ্ক্ষী ও দেশবাসীর মাঝে ফিরিয়ে দেন।
আল্লাহুম্মা রব্বান্-নাস, আযহিবিল বা’স, ইশফি আন্তাশ-শাফি, লা শিফা’আ ইল্লা শিফাউক, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা। আমিন।
মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা
মায়ের ডাক