নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দুর্লভপুর এতিমখানা শিশু সদনকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, ক্যাপিটেশন গ্রান্টের আওতায় থাকা শিশুর সংখ্যা এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষ কেন নীরব—এমন প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, দুর্লভপুর এতিমখানা শিশু সদনের কার্যক্রম বন্ধ বা কার্যত অচল থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটির নামে সরকারি ক্যাপিটেশন গ্রান্ট চলমান রয়েছে। এর মধ্যে আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো—ক্যাপিটেশন গ্রান্টের আওতায় পূর্বে প্রদর্শিত ৭৫ জন শিশুর সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের পর আরও ১৩ জন শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে, ফলে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৮ জন।
এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—প্রতিষ্ঠানটি যদি বাস্তবে বন্ধ থাকে, তাহলে নতুন করে ১৩ জন শিশুর নাম কীভাবে যুক্ত হলো? তাদের প্রকৃত অস্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানটিতে অবস্থান কি সরেজমিনে যাচাই করা হয়েছে?
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। পাশাপাশি নাটোর জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং নলডাঙ্গা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে একাধিকবার বিষয়টি অবহিত করা হলেও দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগের পরও কেন তদন্ত নয়?
একটি সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে এতিম শিশুর সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা যাচাই করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে ৭৫ জন থেকে আরও ১৩ জন শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধির অভিযোগ সামনে আসার পর প্রতিটি শিশুর নাম-পরিচয়, ঠিকানা, অভিভাবকহীনতার প্রমাণ, উপস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানে বাস্তব অবস্থান যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—কাগজে-কলমে শিশুর সংখ্যা বাড়লেই কি সরকারি ক্যাপিটেশন গ্রান্ট পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে? নাকি প্রতিটি শিশুর বাস্তব উপস্থিতি ও যোগ্যতা যাচাই করা হয়েছে?
জহিরুল ইসলাম দরবেশকে ঘিরে প্রশ্ন
দুর্লভপুর এতিমখানা শিশু সদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জহিরুল ইসলাম দরবেশের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রশ্ন উঠেছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
যেমন আওয়ামী লীগ সরকার আমলের সময় সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে দিয়ে ক্যাপিটেশন বাড়িয়ে নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ পতনের পর জামাত ইসলাম যোগদান, জাতীয় নির্বাচন বিএনপি সরকার সরকার গঠনের পর বর্তমানে বিএনপি’র নাম ভাঙিয়ে এই অনিয়ম-দুর্নীতিগুলো করে বেরাচ্ছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশ হলেও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক হিসাব, ক্যাপিটেশন গ্রান্টের তালিকা, শিশুদের উপস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানের বাস্তব কার্যক্রম নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া দরকার।
সরকারি অর্থ কোথায়, কার স্বার্থে?
ক্যাপিটেশন গ্রান্ট মূলত এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণের জন্য সরকারি সহায়তা। ফলে প্রকৃত শিশুদের পরিবর্তে কাগজে-কলমে সংখ্যা দেখিয়ে সরকারি অর্থ গ্রহণের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আর্থিক অনিয়মের প্রশ্ন নয়—এটি প্রকৃত এতিম শিশুদের অধিকার থেকেও বঞ্চিত করার শামিল।
তাই প্রশ্ন উঠছে—দুর্লভপুর এতিমখানা শিশু সদনের ক্যাপিটেশন গ্রান্টের পুরো হিসাব কি কখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে? গত কয়েক বছরের অনুদান কোথায় ব্যয় হয়েছে? প্রতিষ্ঠানে প্রকৃত কতজন শিশু রয়েছে? আর সংবাদ প্রকাশের পর ১৩ জন শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধির ভিত্তিই বা কী?
কর্তৃপক্ষের নীরবতা কেন?
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা কর্তৃপক্ষের কাছে—একাধিক অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশ এবং কর্মকর্তাদের অবহিত করার পরও কেন দৃশ্যমান তদন্ত হচ্ছে না?
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য দ্রুত সরেজমিন তদন্ত, শিশুদের শারীরিক উপস্থিতি যাচাই, ক্যাপিটেশন গ্রান্টের নথি পরীক্ষা, ব্যাংক হিসাব ও ব্যয়ের ভাউচার পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পূর্ববর্তী পরিদর্শন প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি উঠেছে।
অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার করা দরকার।
জনস্বার্থে তাই প্রশ্ন একটাই—দুর্লভপুর এতিমখানা শিশু সদন নিয়ে একের পর এক অভিযোগের পরও কর্তৃপক্ষ নীরব কেন?
এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।