কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার উজিরপুর ইউনিয়নের সামুকসার এলাকায় পরিত্যক্ত হাইওয়ে লিংক পেট্রোল পাম্পের বিপরীত পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিমপাশ ঘেঁষে রাতের আঁধারে দীর্ঘ ২/৩ মাস ধরে সরকারী জায়গার মাটি কেটে নিচ্ছে চিহ্নিত মাটিখেকো বাহাদুর মিয়া। মহাসড়কের পৃষ্ঠতল থেকে এই মাটি কাটার গভীরতা স্থানভেদে ৬০ থেকে ৭০ ফুট।
এই অবৈধ মাটি কাটার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একটি নির্দিষ্ট অংশ ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের দুটি সুবিশাল টাওয়ার এবং পল্লী বিদ্যুৎ এর ৩৩ হাজার ভোল্টের সঞ্চালন লাইনের অন্তত ৫টি খুঁটি হেলে পড়েছে। যার মধ্যে ১টি খুঁটিকে বাঁশের সাপোর্ট দিয়ে আপাতত পতন ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। এর ফলে যেকোন মুহুর্তে এই এলাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনাসহ প্রাণহানির চরম আশংকায় দিনাতিপাত করছে এলাকার সাধারণ মানুষ।
সরেজমিন ঘুরে এলাকার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জানা যায়, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার সুয়াগাজী বাজার সংলগ্ন সুবর্ণপুর গ্রামের তাজুল ইসলামের ছেলে এলাকার চিহিৃত মাটি ব্যবসায়ী বাহাদুরের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘ ২/৩ মাস ধরে এই এলাকার মাটি কেটে নিচ্ছে। রাতের আঁধারে মহাসড়কের এই অংশে বাঁশের বেড়া দিয়ে আঁড়াল করে এসকেভেটর, ভেকো ব্যবহার করে ড্রাম ট্রাকের মাধ্যমে স্থানভেদে ৬০ থেকে ৭০ ফুট গভীর করে মাটি কেটে আশেপাশের ব্রিক ফিল্ডসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছে। প্রচন্ড ক্ষমতাধর এই মাটিখেকোদের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ
জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, পল্লী বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ধ্বসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বারের কাছে এই মাটি খেকোদের বিরূদ্ধে অভিযোগ করেও কোন লাভ হয়নি। বরং অভিযোগকারীদেরকেই সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয়। এ ঘটনায় এলাকার জনমনে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে উজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আবদুল হাই বলেন, সামুকসার এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিমপাশ ঘেঁষে রাতের আঁধারে মাটি কাটার অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে উজিরপুর ইউনিয়নের অবৈধ মাটিকাটা রোধে একটি কমিটি বিদ্যমান। তাদের নিষ্কৃয়তায় অবৈধ মাটিখেকোরা এমন অপরাধে উৎসাহি হয়। তিনি আরও বলেন এই বিষয়ে চৌদ্দগ্রাম এবং সদর দক্ষিণ ২টি থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতির কথা শুনেছি।
উজিরপুর ইউনিয়নের অবৈধ মাটিকাটা রোধে বিদ্যমান কমিটির আহবায়ক উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, সামুকসার এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিমপাশ ঘেঁষে রাতের আঁধারে মাটি কাটার বিষয়টি উজিরপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আবদুল হাই জানিয়েছেন এবং এই ঘটনার সাথে বাহাদুর মিয়া নামের একজনের সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন। তাৎক্ষনিকভাবে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জামাল হোসেনকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে এবং আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে। এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জামাল হোসেন আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন মর্মে কামরুল ইসলামকে আশ্বাস দেন। অবৈধ মাটাকাটা রোধের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা হিসেবে সরাসরি বাধা প্রদান, আইনি সহায়তা কিংবা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে এমন কিছুই করা হয়নি বলে জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এমন গভীরভাবে মাটিকাটার ফলে বিশাল জনগোষ্ঠী চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এ ধরনের মাটি কাটার কারণে ভূমি ধ্বস, মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, আশপাশের বৈদ্যুতিক খুঁটিসহ অন্যান্য স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, চলতি বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের কারণে ভূমিধ্বসের আশঙ্কা কয়েকগুণ বেড়ে গেলো এবং যে কোনো সময় বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা, প্রাণহানি কিংবা বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটতে পারে। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এই ভূমিদস্যূ চক্রের অবৈধ মাটি কাটার কারণে এবং প্রশাসনের নিরব ভূমিকায় স্থানীয় জনজীবন, পরিবেশ ও জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং এটি দেশের প্রচলিত আইন ও বিধিমালারও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, সরকারি অনুমোদন ছাড়া অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন ও ভূমির স্বাভাবিক কাঠামো পরিবর্তন দণ্ডনীয় অপরাধ। জনস্বার্থ ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার দায়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানান তারা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একাধিকবার মৌখিকভাবে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও রহস্যজনক কারণে কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছে, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতে এমন কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জনস্বার্থে এলাকাবাসী অবিলম্বে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। কারণ সময়মতো ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে যে কোনো মুহূর্তে ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটতে পারে।