১৮ আগস্ট ১৯৪৯ সালের এই দিনে তৎকালীন সিলেটের বিয়ানীবাজারের সানেশ্বর-উলুউরি এলাকায় নানকার প্রথা ও জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর সরকারি বাহিনী ও জমিদারদের লোকজন হামলা চালায়। সুনাই নদীর তীরে সংঘর্ষে কয়েকজন কৃষক নিহত ও অনেকে আহত হন। নানকার প্রথা ছিল একটি কঠোর শোষণমূলক ব্যবস্থা। নানকার প্রজারা জমিদারের দেওয়া বাড়ি ও সামান্য জমি ব্যবহার করলেও তার ওপর তাদের মালিকানা ছিল না। বিনা মজুরিতে জমিদার বাড়িতে কাজ করতে হতো তাদের। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে নানকার কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ জমতে থাকে। ১৯২০-এর দশকে শুরু হওয়া নানকার আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া, বালাগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা এই আন্দোলনে যুক্ত হন। আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন কমরেড অজয় ভট্টাচার্য। কৃষকরা জমিদারদের খাজনা দেওয়া এবং তাদের হাট-বাজারে কেনাকাটা বর্জনসহ বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট সানেশ্বর ও উলুউরি গ্রামের কৃষকরা সুনাই নদীর তীরে জমিদারপক্ষ ও সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সশস্ত্র বাহিনীর সামনে লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রতিরোধ করতে গিয়ে কয়েকজন কৃষক প্রাণ হারান। এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার মধ্য দিয়ে নানকার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি বেদনাবিধুর অধ্যায় রচিত হয়। নানকার কৃষকদের আত্মত্যাগ ও দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালে জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্ত এবং নানকার প্রথার অবসান ঘটে। কৃষকদের ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হয়। প্রতি বছর ১৮ আগস্ট বিয়ানীবাজারসহ সিলেটের বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নানকার দিবস পালিত হয়। দিবসটি শুধু অতীতের একটি রক্তাক্ত ঘটনার স্মরণ নয়; বরং শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে কৃষক ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেরও প্রতীক। নানকার বিদ্রোহের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা, শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি।