কক্সবাজারের উখিয়ায় মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ ও পোস্ট দেওয়ায় এক কলেজছাত্রকে প্রকাশ্যে অস্ত্র ঠেকিয়ে অপহরণ, পৈশাচিক নির্যাতন এবং গরুর চোর সাজিয়ে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার নজিরবিহীন অভিযোগ উঠেছে। হামলায় ওই তরুণসহ তার ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ পিতা ও ৬৬ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ও সন্ধ্যায় দুই দফায় উখিয়া থানার ১নং জালিাপালং ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের সোনাইছড়ি এলাকায় এই নৃশংস ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে উখিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করে। এ ঘটনায় সোমবার রাতে কক্সবাজার সরকারি কলেজের বিএ (সম্মান) শেষ বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ শেখ সাইদী (২৫) বাদী হয়ে উখিয়া থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় ৪/৫ জনকে আসামি করে একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেছেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এক অভিযান চালিয়ে উখিয়ার কুতুপালং পুলিশ ক্যাম্পে কর্মরত এপিবিএন কনস্টেবল রেজাউল করিমের বোন ও পরিবারের সদস্যদের বাসা থেকে ৯০ হাজার পিস ইয়াবা এবং নগদ ৩৬ লাখ ২০ হাজার ৮৫০ টাকা উদ্ধার করে। উক্ত ঘটনায় ৩ জন গ্রেফতার হয় এবং রেজাউল করিমের বিরুদ্ধেও মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
উক্ত এপিবিএন সদস্য রেজাউল করিম হলেন মামলার ১ নম্বর আসামি ছিদিক আহমদের জামাতা। এলাকায় মাদক ও মানবপাচার বিরোধী সামাজিক অবস্থান থেকে বাদী শেখ সাইদী এ সংক্রান্ত সংবাদের নিচে ফেসবুকে মন্তব্য ও পোস্ট দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ছিদিক আহমদ ও তার পরিবারের সদস্যরা সাইদী ও তার পরিবারকে অপহরণ ও হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল।
১৪ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫:২০ টার দিকে শেখ সাইদী পায়ে হেঁটে সোনার পাড়া বাজারে যাওয়ার পথে স্থানীয় আলী মোহাম্মদের ঘরের পাশে পৌঁছালে পূর্বপরিকল্পিতভাবে দেশীয় তৈরি বন্দুক, ছেনি, লোহার হাতুড়ি ও লাঠিসোটা নিয়ে আসামিরা তার উপর হামলা চালায়।
১নং আসামি ছিদিক আহমদ ছেনি দিয়ে সাইদীর মুখে কোপ মেরে ঠোঁট ও মুখমণ্ডল রক্তাক্ত ক্ষতবশত করে। ২নং আসামি ইউছুপ জালাল, ৩নং আসামি জুয়েল ও ৪নং আসামি সোহেল লোহার হাতুড়ি দিয়ে তার মাথা, ঘাড়, বুক, পিঠ ও কোমর থেঁতলে দেয়। রক্তাত অবস্থায় সাইদীকে টানাহেঁচড়া করে প্রায় ২০০ গজ দূরে ছিদিক আহমদের বসতবাড়িতে নিয়ে আটকে রাখা হয়। সেখানে ঘটনা ভিন্নখাতে মোড় নিতে ছিদিক আহমদের নির্দেশে আসামিরা সাইদীর কোমর ও দুই পায়ে একটি কালো রঙের বলদ গরু বেঁধে রেখে “গরু চোর” অপবাদ দিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালায়।
৩নং আসামি জুয়েল বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করার হুমকি দিলে সাইদী প্রাণভয়ে আসামিদের শেখানো “আমি গরু চুরি করেছি” মর্মে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হন। আসামিরা সেই ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়।
ছেলের ওপর নির্যাতনের খবর পেয়ে সন্ধ্যায় সাইদীর বৃদ্ধ বাবা মোহাম্মদ হাশেম (৭২) ও মা মালেকা বেগম (৬৬) ঘটনাস্থলে গেলে আসামিরা তাদের ওপরও চড়াও হয়। হাতুড়ির আঘাতে পিতা মোহাম্মদ হাশেমের মুখের সামনের কাঁচা দাঁত ভেঙে রক্তপাত হয় এবং বৃদ্ধা মাতাকে টানা-হেঁচড়া করে শ্লীলতাহানি ঘটায় আসামিরা।
একপর্যায়ে সাইদী কৌশলে বাঁধন খুলে পার্শ্ববর্তী আত্মীয়ের ঘরে আশ্রয় নেন এবং জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করেন। উখিয়া থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালে আসামিরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ ও স্থানীয় জনতা আহতদের উদ্ধার করে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করায়।
মামলার প্রধান আসামিরা হলেন -ছিদিক আহমদ (৪৯),ইউছুপ জালাল (৪২),মোঃ জুয়েল (২২),মোঃ সোহেল (২০),নুরুল আমিন (২১), মোঃ শামশু (২৬),মোঃ রিয়াদ (২২), শাহ আমিন (২১),(সবাই সোনাইছড়ি, ২নং ওয়ার্ড, জালিয়াপালং ইউপি, উখিয়া)এ ঘঠনার পর পরই কক্সবাজার, কোটবাজার, উখিয়া সহ জেলায় বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদের ঝড় উঠে এবং বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
এ বিষয়ে উখিয়া থানার পুলিশ প্রশাসন জানায়, ৯৯৯-এর বার্তা পেয়ে ভুক্তভোগীদের তাৎক্ষণিক উদ্ধার করা হয়েছে এবং লিখিত অভিযোগ (এজাহার) নথিভুক্ত করা হয়েছে। আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।