প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত গাজীপুরের কাশিমপুরের জনজীবন। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় দিনের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে। এতে আবাসিক গ্রাহকের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যেই কাশিমপুরের বিভিন্ন সড়কে দিনের বেলাতেও সড়কবাতি জ্বলে থাকতে দেখা গেছে।
সম্প্রতি আলী নেওয়াজ খান পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে কাঠালতলা-রওশন মার্কেট সড়ক এবং কাশিমপুর সুরাবাড়ি নয়াপাড়া এলাকায় একাধিক ল্যাম্পপোস্টে দিনের আলোয় সড়কবাতি জ্বলতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো কোনো স্থানে দীর্ঘ সময় ধরে এসব বাতি জ্বলে থাকে। বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে দিনের আলোয় সড়কবাতি জ্বলে থাকা অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টিকে সামনে এনেছে।
কাশিমপুর পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডিজিএম মামুনুর রশিদ জানান, “বর্তমানে কাশিমপুর এলাকায় বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১১০ মেগাওয়াট। বিপরীতে গড়ে প্রায় ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে চাহিদার তুলনায় প্রায় ৫০ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির কারণেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।”
মামুনুর রশিদ বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হলে লোডশেডিং পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে। কাশিমপুরে ৩৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুন বা জুলাইয়ের দিকে উৎপাদনে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।” এটি চালু হলে কাশিমপুরে বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকবে না বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কাশিমপুর শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানে আবাসিক গ্রাহকের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগ রয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ছে।
তবে লোডশেডিংয়ের প্রভাব শুধু শিল্প ও ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নেই। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে স্কুল-কলেজের শ্রেণিকক্ষে বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীদের গরম ও অস্বস্তিকর পরিবেশে ক্লাস করতে হচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাসাবাড়িতেও একই ধরনের ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। সারাদিনের কাজ শেষে মানুষ যখন ঘরে ফিরে বিশ্রাম নিতে চান, তখন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক বিশ্রাম ব্যাহত হচ্ছে। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং অনেকের নিয়মিত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। টানা গরম ও অনিয়মিত বিশ্রামের কারণে শারীরিক ক্লান্তি বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে সড়কবাতি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন। সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি সড়কবাতির জন্য পৃথক বৈদ্যুতিক সুইচের ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণত সন্ধ্যার পর বাতি চালু এবং সকালে বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সুইচ পরিচালনার ক্ষেত্রেও দায়িত্বপ্রাপ্তদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তবে দিনের বেলায় বিভিন্ন সড়কে বাতি জ্বলে থাকার ঘটনায় বিদ্যুৎ অপচয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিদ্যুৎ সংকটের সময় প্রয়োজনীয় ব্যবহারের বাইরে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ না করাই যেখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে দিনের আলোয় সড়কবাতি জ্বলে থাকা পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি উঠেছে।
সড়কবাতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের মাধ্যমে সময়মতো বাতি বন্ধ করার ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে এ ধরনের অপচয় কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে দিনের বেলায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে জ্বলে থাকা বাতিগুলো শনাক্ত করে দ্রুত বন্ধ করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা জানান, “বিষয়টি জানা ছিল না। এখন জানতে পারলাম।”
দ্রুতই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
কাশিমপুরে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকায় লোডশেডিং পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে চলমান ৩৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন প্রকল্প চালু হলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ আশা করছে।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে একদিকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মজীবী মানুষ দিনের পর দিন পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রচণ্ড গরমের অতিরিক্ত ভোগান্তি। ফলে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি সংকটের সময়ে বিদ্যুতের অপচয় রোধে সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
একদিকে ঘাটতির কারণে মানুষকে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, অন্যদিকে দিনের আলোয় সড়কবাতি জ্বলে থাকছে—বিদ্যুৎ সংকটের এই সময়ে এমন অপচয় বন্ধে কার্যকর নজরদারি ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি।