পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজশাহীর গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে নগরকেন্দ্রিক পশুর হাটগুলোতে ধীরে ধীরে জমে উঠছে কোরবানির প্রস্তুতি। এখনও ঈদের প্রায় তিন সপ্তাহ বাকি থাকলেও জেলার বিভিন্ন প্রান্তের খামারিরা ইতোমধ্যে বাজারমুখী করেছেন তাদের লালন-পালন করা গবাদিপশু। কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে আগাম বেচাকেনাও। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও দেশীয় উৎপাদনের ওপর ভর করেই কোরবানির বাজার সচল থাকবে। বরং স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত পশু দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে মোট ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১১টি পশু। এর মধ্যে গরু ১ লাখ ৪ হাজার ৮৪১টি, মহিষ ৩ হাজার ৪২৫টি, ছাগল ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৩৯টি এবং ভেড়া ৪৩ হাজার ৪০৬টি। বিপরীতে জেলায় সম্ভাব্য কোরবানির চাহিদা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৮টি পশু। সেই হিসাবে চাহিদার তুলনায় প্রায় ৯১ হাজার ৯৫৩টি পশু উদ্বৃত্ত থাকছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু রাজশাহী জেলাই নয়, পুরো বিভাগজুড়েই কোরবানির পশুর সরবরাহ এবার আশাব্যঞ্জক অবস্থানে রয়েছে। বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগে প্রায় ৪৩ লাখ পশু প্রস্তুত রয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ। ফলে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও পশু সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একসময় সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলের কোরবানির বাজার অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল ভারতীয় গরুর ওপর। তবে সীমান্তে নজরদারি জোরদার হওয়া এবং অবৈধ পশু প্রবেশ কমে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে দৃশ্যপট বদলে গেছে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে স্থানীয় খামারিরাই। জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলায় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় বাণিজ্যিক খামার। ফলে একদিকে যেমন দেশীয় উৎপাদন বেড়েছে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী বিভাগজুড়ে তিন শতাধিক কোরবানির হাট বসানোর প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় ইতোমধ্যে সীমিত আকারে বেচাকেনা শুরু হয়েছে। তবে ঈদের শেষ সপ্তাহেই হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার সবচেয়ে বেশি উপস্থিতি দেখা যাবে বলে ধারণা ব্যবসায়ীদের।
গোদাগাড়ী উপজেলার খামারি আব্দুল মালেক জানান, দেশীয় পদ্ধতিতে গরু লালন-পালনের কারণে তার খামারের পশুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। যদিও এ বছর গো-খাদ্য ও পরিচর্যা ব্যয় বেড়েছে, তারপরও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকবে বলে তিনি আশা করছেন।
তানোর উপজেলার খামারি সুজন আলী বলেন, পরিকল্পিতভাবে প্রায় ছয় মাস আগে গরু পালন শুরু করেন তিনি। শুরুতে খাদ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও বর্তমানে পশুগুলো বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠেছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়ার ব্যাপারেও তিনি আশাবাদী।
পবা উপজেলার খামারি রফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে পরিচর্যার মাধ্যমে দেশীয় পদ্ধতিতে গরু ও ছাগল পালন করেছেন তিনি। তবে এবছর পশুখাদ্য, ভিটামিন ও ওষুধের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এরপরও কোরবানির বাজারে দেশীয় পশুর চাহিদা থাকায় লোকসানের আশঙ্কা দেখছেন না তিনি।
অন্যদিকে বাগমারা উপজেলার খামারি আকলিমা আক্তার জানান, ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনায় তিনি বড় গরুর পাশাপাশি মাঝারি আকারের গরু, ছাগল ও ভেড়া পালন করেছেন। ঈদের বাজারে এসব পশুর ভালো চাহিদা থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।
নগরীর মোহনপুর এলাকার খামারি রুবেল হোসেন মনে করেন, দেশীয় খামার শিল্পকে আরও প্রণোদনা দেওয়া গেলে ভারতীয় পশুর ওপর নির্ভরশীলতা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তিনি বলেন, “দেশে পরিকল্পিতভাবে গবাদিপশু খাতকে এগিয়ে নেওয়া গেলে শুধু কোরবানির বাজার নয়, সারাবছরই এই খাত জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।”
রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ পরিচালক ড. আনন্দ কুমার অধিকারী বলেন, কোরবানির পশুর হাটগুলোতে ভেটেরিনারি সেবা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে উদ্বৃত্ত পশু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজারজাত করতে খামারিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান বলেন, “আগের বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও দেশীয় পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে। অতিরিক্ত পশু দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করা গেলে খামারিরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। এতে ভবিষ্যতে গবাদিপশু পালনে তাদের আগ্রহ আরও বাড়বে।”