আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণা তুঙ্গে থাকলেও মানিকগঞ্জ–২ আসনের ভোটের মাঠ শুরু থেকেই তুলনামূলকভাবে নিরুত্তাপ। পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার ও চায়ের দোকানে সীমিত আলোচনা চললেও সাধারণ ভোটাররা প্রকাশ্যে ভোটের বিষয়ে কথা বলতে অনাগ্রহী। তবে শেষ মুহূর্তে প্রার্থীদের গণসংযোগে ধীরে ধীরে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে।
সিংগাইর ও হরিরামপুর উপজেলা এবং মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার হাটিপাড়া ও ভাড়ারিয়া ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ–২ আসনটি। রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এই আসনের রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ বর্ণাঢ্য।
আশির দশকে সিংগাইর–সাটুরিয়া ও মানিকগঞ্জ সদর নিয়ে গঠিত ছিল মানিকগঞ্জ–৪ আসন। সে সময় তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (১৯৮৬ ও ১৯৮৮) জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম সারওয়ার মিলন টানা দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ওই সময় শিক্ষা উপমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
নব্বইয়ের গণতন্ত্রোত্তর সময়ে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে টানা তিনবার জয়লাভ করেন বিএনপির তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শিল্পপতি শামসুল ইসলাম খান নয়ামিয়া। ২০০৬ সালে বার্ধক্যজনিত কারণে তার মৃত্যুর পর উপনির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তার পুত্র ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত।
পরবর্তী সময়ে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মানিকগঞ্জ জেলার চারটি আসন পুনর্বিন্যাস করে তিনটি আসনে রূপান্তর করা হয়। এতে নতুনভাবে সিংগাইর, হরিরামপুর ও মানিকগঞ্জ সদরের একাংশ নিয়ে গঠিত হয় মানিকগঞ্জ–২ আসন।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম আব্দুল মান্নান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হারুনার রশিদ খান মুন্নুর কন্যা ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আফরোজা খান রিতাকে পরাজিত করেন। এর মাধ্যমে ১৮ বছর পর পুনরায় জাতীয় পার্টি এই আসনটি পুনরুদ্ধার করে।
২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম টানা দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মমতাজ বেগমকে পরাজিত করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন নিজ দলীয় দেওয়ান জাহিদ আহমেদ টুলু।
এবারের নির্বাচনে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন—
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত,
জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আব্দুল মান্নান,
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ আলী এবং
১০ দলীয় জোটের প্রার্থী মুহাদ্দিস শেখ মো. সালাহ উদ্দিন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা ও দৃশ্যমান প্রচারণায় ধানের শীষ প্রতীক কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ দীর্ঘদিনের কোন্দল অনেকটাই নিরসন হওয়ায় ধানের শীষের প্রচারণায় নতুন গতি এসেছে। থানা বিএনপির সভাপতি আবিদুর রহমান খান রোমান মনোনয়ন প্রত্যাহার করে ধানের শীষের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। পাশাপাশি সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মাহাবুবুর রহমান মিঠু ও পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম ভূঁইয়াসহ স্থানীয় নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট চাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাঠের চিত্রে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও ভোটের চূড়ান্ত ফল নির্ভর করছে নীরব ভোটার এবং জোট সমীকরণের গতিপ্রকৃতির ওপর। সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন—এমন গোপন ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেয়ালঘড়ি প্রতীকের দিকে ঝুঁকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী সরাসরি প্রার্থী না দেওয়ায় ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে খেলাফত মজলিসের শেখ মো. সালাহ উদ্দিন নীরব ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় দলটির একটি অংশের ভোট জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে স্থানান্তরিত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে মাঠপর্যায়ে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকলেও শেষ মুহূর্তের ভোটের ফলে এস এম আব্দুল মান্নানের অবস্থান প্রভাবিত হতে পারে।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোট নিয়ে এখনো তেমন উত্তাপ নেই। অনেকেই জানিয়েছেন, পরিবেশ অনুকূলে থাকলে তারা ভোট দিতে যাবেন, অন্যথায় ভোটার উপস্থিতি কম হতে পারে।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩২ হাজার ৮১৮ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৭১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪ জন ও ১৮৫ কেন্দ্র।
সব মিলিয়ে প্রচারণায় ধানের শীষ প্রতীক কিছুটা এগিয়ে থাকলেও নীরব ভোট, জোট সমীকরণ এবং শেষ মুহূর্তের ভোট স্থানান্তরের হিসাব মিলিয়ে মানিকগঞ্জ–২ আসনের চূড়ান্ত ফলাফল এখনো অনিশ্চিত বলেই মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।