নরসিংদীর পলাশ উপজেলা ৯৪ দশমিক ৪৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি জনবহুল ও সম্ভাবনাময় অঞ্চল। প্রায় তিন লাখ মানুষের বসবাস এই উপজেলায়। চারটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত পলাশ উপজেলা শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাশাপাশি প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ। শীতলক্ষ্যা, হাড়িদোয়া ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা দোআঁশ, বেলে ও এঁটেল মাটির কারণে এখানে বৃক্ষরোপণের অনুকূল পরিবেশ বিরাজমান।
উপজেলার প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় দেখা যায় আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, জলপাই ও তেঁতুলের মতো ফলজ গাছ। পুকুরপাড় ও খোলা জায়গায় রয়েছে জারুল, হিজল, ছাতিম, শিমুল, মেহগনি, পলাশসহ নানা প্রজাতির বনজ বৃক্ষ। পাশাপাশি ঔষধি গাছ হিসেবে আমলকী, বহেরা, হরীতকী ও অর্জুনের চাষও লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব গাছের একটি বড় অংশ বন বিভাগের সরকারি নার্সারি থেকে ন্যায্যমূল্যে সংগ্রহ করে রোপণ করা হয়েছে।
পলাশ উপজেলা বন কর্মকর্তা আমিরুল হাসান জানান, এক সময় সরকারি নার্সারিতে বছরে ৫০ হাজারেরও বেশি চারা উৎপাদন করা হতো। তখন জারুল, পলাশ, শিমুলসহ দেশীয় বৃক্ষের বিস্তার ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু বর্তমানে জায়গার সংকটের কারণে উৎপাদন সীমিত হয়ে পড়েছে। এখন গড়ে মাত্র ১০ হাজার চারা উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে, যা উপজেলার চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেও চারা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একসময় সরকারি নার্সারির জন্য নির্ধারিত বৃহৎ জায়গার একটি অংশ উপজেলা পরিষদের আওতায় নেওয়া হয়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে নার্সারির পরিসর ছোট হয়ে যায় এবং চারার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
পরিবেশবিদরা মনে করেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। অথচ বেসরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন নার্সারিতে একটি চারার দাম যেখানে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বা তারও বেশি, সেখানে সরকারি নার্সারিতে একই চারা মাত্র ৯ টাকায় পাওয়া যায়। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এসব চারা ন্যায্যমূল্যে বিক্রি ও প্রয়োজনে বিতরণ করা হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি।
পলাশ উপজেলার স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, সরকারি নার্সারিটি উপজেলার বৃক্ষচাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তাই নার্সারির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং নিয়মিত তদারকি করা শুধু বন বিভাগের নয়, বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব।
তাঁদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও প্রশাসনিক সহযোগিতা পেলে পলাশের সরকারি নার্সারি আবারও পরিবেশবান্ধব ‘অক্সিজেন কারখানা’ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে—যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক টেকসই সবুজ উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।