সিলেটে ওয়ার্ক পার্মিট ভিসায় বিদেশে পাঠানোর নামে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার ইনাতগঞ্জ ইউনিয়নের বক্তারপুর গ্রামের তফাজ্জুর রহমান কামালের ছেলে মিসবাউর রহমান শিশির।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিসবাউর রহমান শিশির। কনসালটেন্ট পদে চাকরি করতেন সিলেট নগরীর নয়াসড়কস্থ এডুকেশন হাব নামে স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি ফার্মে। পরিচয় দিতেন সিলেটের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। একসময় চাকরি ছেড়ে যৌথ উদ্যোগে খুলেন এডুবার্ড কনসালটেন্সি ফার্ম। সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারস্থ এলিগ্যান্ট শপিংমলের ৭ম তলার অফিস থেকে পরিচালিত এডুবার্ড কনসালটেন্সির অপর দুই সহযোগী ছিলেন সিলেটের আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা কাজী আব্দুল ওদুদ আলফু চেয়ারম্যানের ছেলে কাজী সাইদ এবং ছাত্রলীগ নেতা শাহ আলম জার্নেল। যৌথ মালিকানায় এডুবার্ড কনসালটেন্সি ফার্ম হলেও প্রতিষ্ঠানের সিইও পদ বাগিয়ে নেন শিশির।
এডুবার্ড কনসালটেন্সির সিইও পদ বাগিয়ে নেয়া শিশিরের চতুরতা একসময় পরিলক্ষিত করেন সাইদ জার্নেল। মানুষ জনের প্রতারিত হওয়া ও প্রতিষ্ঠানের দুর্নাম ঠেকাতে এডুবার্ড থেকে শিশির কে বের করে দেন জার্নেল ও সাইদ। এসময় শিশির কিছুটা থমকে গেলেও যুক্তরাজ্যে থাকা তার মামা মামুন আহমেদ এর আশকারায়, সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকার তন্ময় নামের এক সহযোগীকে সাথে নিয়ে নিজেই খুলে বসেন ইউনি স্কাই নামে কনসালটেন্সি ফার্ম। সিলেটের জিন্দাবাজার এলিগ্যান্ট শপিংমলের ১১ তলায় অফিস খুলে চলতে থাকে কার্যক্রম।
বিদেশ গমনেচ্ছু সাধারণ মানুষজনের টাকা হাতিয়ে নেয়ার কৌশল হিসেবে ইউনি স্কাই কনসালটেন্সি ফার্ম দেখিয়ে শুরু করেন প্রতারণা। বিভাগীয় শহর সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তুলেন প্রতারণার নেটওয়ার্ক। তাকে এ কাজে সহযোগিতা করেন অপর সহযোগী তন্ময়। ওয়ার্ক পার্মিট ভিসায় বিদেশে ভালো কাজ সুযোগ সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে একেক জনের কাছ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিতে থাকেন। সেই টাকার পরিমাণ কয়েক কোটি ছাড়িয়ে গেলে বিলাসী জীবনযাপন শুরু করেন একসময় সিলেটের উপশহর পিতার সাথে ভাড়া বাসায় থাকা শিশির।
রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়া শিশির নিজেকে ধনীর আলালের দুলাল হিসেবে জানান দিতে ক্রয় করেন কোটি টাকা দামের বিলাসবহুল গাড়ি। ঢাকা-সিলেটের অভিজাত হোটেলগুলোতে সিসা, মাদক সেবনের সাথে চলে রাতভর আড্ডা। চুক্তি অনুযায়ী সময়মত কাজ সমাপ্ত করতে না পারায় লোকজন টাকা ফেরত চাইলে শুরু করেন তালবাহানা, ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরতে চাপ বাড়তে থাকলে গা-ঢাকা দেন শিশির। এনিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন মাজিস্ট্রেট আদালতে সিরাজুল ইসলাম নামের এক ভুক্তভোগী মামলা করলে সুযোগ বুজে শিশির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে পালিয়ে যান ঢাকায়। যার মামলা নং শাহপরান রঃ সিআর ৪২২/২৪ইং।
শিশিরের গ্রামের বাড়ি নবীগঞ্জের ইনাতগঞ্জ গিয়ে জানা যায়, তার পিতা তফাজ্জুর রহমান এলাকায় কামাল নামে পরিচিত, ছিলেন বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডের বালু পাথর সাপ্লায়ার। তার বিরুদ্ধেও পারিবারিক সম্পত্তি আত্মসাতের গুঞ্জন রয়েছে এলাকায়। ব্যবসায় সুবিধা করতে না পারায় পরিবার সহ পাড়ি জমান সিলেটে। শুরুতে কাপড় ও টেইলারিং ব্যবসা করলেও ছেলের অপকর্ম আড়াল করতে তিনিও পরিবার নিয়ে সিলেট থেকে ঢাকায় পালিয়ে যান।
সূত্রমতে, ট্রাভেল এজেন্সি পরিচালনার জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন প্রয়োজন হলেও কনসালটেন্সি ফার্ম পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া অন্য কোন নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা না থাকায় যত্রতত্র গড়ে উঠেছে কনসালটেন্সি ফার্ম। শুধু সিলেট নগরীতেই রয়েছে পাঁচ শতাধিক কনসালটেন্সি ফার্ম। ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে পারিচালিত এসব ফার্ম বছরে শতকোটি টাকার ব্যবসা করলেও তাদের তদারকিতে সরকারি কোন দপ্তর না থাকায় রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, সাধারণ মানুষজনেরা হচ্ছে প্রতারিত।
কনসালটেন্সি ফার্ম ব্যবসায়ীদের সংগঠন, ফরেন এডমিশন এন্ড ক্যারিয়ার ডেভলাপমেন্ট কনসালটেন্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ফ্যাড-ক্যাব) সিলেট জোন অফিসে গিয়ে কার্যালয় তালা দেয়া পাওয়া যায়, কার্যালয়ের মোবাইল নাম্বারে কল দিলে রিসিভ না করায় বক্তব্য সংগ্রহ করা যায়নি।
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস সিলেটের সহকারী পরিচালক নাজমুস সাকিব জানান, কনসালটেন্সি ফার্ম গুলো তদারকি বা অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য তাদের কাছে সরকারি কোন নির্দেশনা নেই।