কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ঈদগড় রেঞ্জের তুলাতলী বন বিটের এক বনকর্মীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সড়কে চলাচলকারী ছোট যানবাহন থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত বনকর্মী মোহাম্মদ হাসান। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড চললেও মামলা ও হয়রানির আশঙ্কায় অধিকাংশ ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঈদগড়-বাইশারী সড়কে ছোট বাঁশ, জ্বালানি কাঠ ও অন্যান্য বনজ সামগ্রী বহনকারী ভ্যান, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ছোট যানবাহন থামিয়ে অর্থ দাবি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত অঙ্কের টাকা পরিশোধ করলে যানবাহন ছেড়ে দেওয়া হয়, আর টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গাড়ি বিট অফিসে নিয়ে যাওয়া, মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো কিংবা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন এক ভুক্তভোগী ‘কুতুবী’ (ছদ্মনাম) বলেন, “আমি গরিব মানুষ। বনের মরে যাওয়া গাছের ডালপালা সংগ্রহ করে বিক্রি করেই সংসার চালাই। হাসান মুন্সি আমাদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নেয়। টাকা না দিলে গাড়ি আটকিয়ে বিট অফিসে নিয়ে যায়। টাকা না দেওয়া পর্যন্ত ছাড়ে না। কেউ প্রতিবাদ করলে বন আইনে মামলা দেওয়ার হুমকি দেয়।”
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। নিরাপত্তার স্বার্থে তারাও নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাদের দাবি, বনকর্মী মোহাম্মদ হাসান প্রায় নিয়মিত অর্থ আদায় করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয়ভীতি, গালিগালাজ এবং বন আইনে মামলার হুমকি দেওয়া হয়। এসব অভিযোগের সমর্থনে একাধিক ভুক্তভোগীর অডিও ও ভিডিও বক্তব্য প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
অনুসন্ধানে প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি ভিডিওতে একটি অটোরিকশা থামিয়ে চালকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের দৃশ্য দেখা যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বনকর্মী মোহাম্মদ হাসান ছোট যানবাহন থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে কোন আইন বা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে ওই অর্থ আদায় করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অর্থ আদায়ের বিষয়টি শুধু বনজ সামগ্রী পরিবহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাড়ির ব্যবহারের জন্য বহন করা দা, ছোট বাঁশ, জ্বালানি কাঠসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়েও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হয়। প্রতিবাদ করলেই বন আইনে মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ তাদের।
এদিকে স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, এসব অর্থ আদায়ের পেছনে তুলাতলী বন বিট অফিসেরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তাদের অভিযোগ, বিট কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের নির্দেশ বা প্রত্যক্ষ মদদেই এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিট কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো খুদে বার্তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
ঈদগড় রেঞ্জ কর্মকর্তা তৌকির হাসান বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। অভিযোগের পক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে বনকর্মী মোহাম্মদ হাসানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের আরও দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের মাধ্যমে বনকর্মী মোহাম্মদ হাসান উল্লেখযোগ্য সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার নামে দামি গাড়ি ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে বলেও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। তবে এই দাবির স্বাধীন সত্যতা প্রতিবেদকের পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগ, বন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি হয় এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসে।