মানবপাচার ও ভিসা-পাসপোর্ট জালিয়াতির সাথে জড়িত ভয়ঙ্কর চক্রের মূল হোতা আসাদুজ্জামান আসাদ ও আমিনুল ইসলামসহ মোট ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)। তাদের গ্রেফতারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় দুটি বড় মানবপাচার সিন্ডিকেটের কার্যক্রমে বড় ধাক্কা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কোটি কোটি টাকার মালিক আসাদ
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার দক্ষিণ তিতপাড়া গ্রামের মোঃ মাইনুদ্দিনের ছেলে মোঃ আসাদুজ্জামান আসাদ অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। এলাকায় জমি, বাড়ি, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, বিলাসবহুল গাড়ি কেনাসহ আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে ওঠা আসাদের উত্থানের পেছনে ছিল ভয়াবহ মানবপাচারের অন্ধকার অধ্যায়।
মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলার শতাধিক পরিবার অভিযোগ করেছে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিজনের কাছ থেকে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ করে শুধু মাদারীপুর জেলাতেই প্রায় ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় আসাদ। কিন্তু প্রতিশ্রুত স্বপ্নের ইউরোপযাত্রা কখনোই বাস্তবে রূপ নেয়নি। ফলে অনেক পরিবার পথে বসে সরকারের কাছে ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করছে।
আসাদের ছোট ভাই নুরুল ইসলামের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে ছবি পাওয়া নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এছাড়া, লিবিয়ায় অবস্থানকালে আসাদ আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের অন্যতম প্রধান সদস্য ‘মাফিয়া আবদুল্লাহ’র সাথেও কাজ করেছেন বলে বিদেশি সূত্রে জানা গেছে। কোন কোন তথ্য মতে এই আসাদে হচ্ছে লিবিয়ার সেই মাফিয়া আব্দুল্লাহ।
সম্প্রতি র্যাব-২ ঢাকার হাজারীবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে আসাদুজ্জামান আসাদ, তার ভাই নুরুল ইসলামসহ তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা মানবপাচারের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে দৈনিক ঘোষণা প্রতিনিধিকে জানায়
এছাড়া ডিমলা থানায় যোগাযোগ করে যানা যায় তাদের গ্রেফতার বিষয়ে ডিমলা থানা এখনো কোন তথ্য নেই তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নজরে আসে।
অন্যদিকে, রবিবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাতে এনএসআই রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের আরেক হোতা আমিনুল ইসলাম (৪৬) এবং তার চার সহযোগী—আব্দুল রহিম (৫৫), নুর ইসলাম (৩১), আসাদুজ্জামান (৩৫) ও শাহরিয়ার শেখ মুরাদ (৪২)-কে গ্রেফতার করে।
এ চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ভিসা ও পাসপোর্ট জালিয়াতির মাধ্যমে মানুষকে বিদেশে পাঠিয়ে আসছিল। তাদের কাছ থেকে বিপুল সংখ্যক ভুয়া পাসপোর্ট, ভিসা ও জাল নথি উদ্ধার করেছে এনএসআই।
তদন্তে জানা গেছে, আমিনুল চক্র বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে প্রতারণা করত এবং শোষণ-নির্যাতনের শিকার হত সাধারণ মানুষ। তারা মধ্যপ্রাচ্য, লিবিয়া ও ইউরোপমুখী আন্তর্জাতিক মানবপাচার সিন্ডিকেটের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, মানবপাচার ও জালিয়াতির সাথে জড়িত এই চক্রগুলোর অন্য সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। সাধারণ জনগণকে সচেতন থাকতে অনুরোধ জানানো হয়েছে, বিশেষ করে বিদেশগামী প্রবাসপ্রত্যাশীদের বৈধ কাগজপত্র যাচাই না করে কারও প্রলোভনে প্রবাস যাত্রায় না জড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া আসাদুজ্জামান আসাদ এবং আন্তর্জাতিক ভিসা জালিয়াত চক্রের হোতা আমিনুল ইসলামের গ্রেফতার মানবপাচার দমনে একটি বড় অর্জন। তবে প্রতারিত দুই শতাধিক পরিবার এখনো ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। দেশের নিরাপত্তা ও মানুষের সুরক্ষার স্বার্থে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।