বাংলাদেশে “গুম” ও “জোরপূর্বক নিখোঁজ” এখন বহুল আলোচিত দুটি শব্দ। গত দেড় দশকে এ ধরনের অসংখ্য ঘটনার কারণে মানবাধিকার প্রশ্নটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপহরণ, গুমের আশঙ্কা, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার অভিযোগ নতুন কোনো ঘটনা নয়। আমার জীবনের অভিজ্ঞতায় এর সূচনা ঘটে ২০০১ সালের জুন মাসে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে।
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দক্ষিণাঞ্চল সফরে বের হন। সেই সফরের অংশ হিসেবে তিনি মাদারীপুরের কাওড়াকান্দি ফেরিঘাট ও কাজীরটেক এলাকায় যান। সে সময় রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে ছিল।
কাজীরটেক এলাকায় তাঁর গাড়িবহর পৌঁছানোর পর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীদের একটি অংশ বহরে হামলা চালায়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নেতাকর্মীরা জীবন বাঁচাতে ছুটোছুটি শুরু করেন। আমি তখন গাড়িবহরের সঙ্গেই ছিলাম। হঠাৎ কয়েকজন আমাকে জোরপূর্বক একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। পরে জানতে পারি, মোস্তাপুর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান রব খাঁর অনুসারী বারী মাতুব্বর এর নেতৃত্বে আমাকে অপহরণ করা হয়েছিল। বারী মাতুব্বরের নেতৃত্বে আমাকে চেয়ারম্যানের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি তখন বুঝতে পারছিলাম না আমাকে কোথায় নেওয়া হচ্ছে কিংবা আমার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে।
একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য সেটি ছিল জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুহূর্তগুলোর একটি। যে ঘরে আমাকে আটকে রাখা হয়েছিল, সেখানে খাটের নিচে দেশি-বিদেশি অস্ত্র রাখা ছিল। আমার সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারি, গভীর রাতে আমাকে জঙ্গলে নিয়ে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমি মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত অবস্থায় কাটাই। প্রতিটি মুহূর্ত মনে হচ্ছিল, এটাই হয়তো জীবনের শেষ রাত। পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে পুলিশের অভিযানে। মাদারীপুর সদর থানার তৎকালীন ওসি মোল্লার নেতৃত্বে পুলিশ অভিযান চালিয়ে আমাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। আমি তখন অপহরণের মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু এরপর ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। সেই রাতেই তৎকালীন সংসদ সদস্য শাহজাহান খান থানায় আসেন। তাঁর আগমনের আগে আমাকে ওসির কক্ষ থেকে অন্য একটি কক্ষে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে আমার গ্রামের বাড়ি খুলনায় জেনে আমাকে হাজতে পাঠানো হয়। এরপর আমার বিরুদ্ধে শীর্ষ সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের সহযোগী হিসেবে একটি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে বলে আমি জানতে পারি। সে সময় জেলার পুলিশ সুপার ছিলেন শফিক সাহেব। সেই রাতেই আমাকে মাদারীপুর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। শুরু হয় দীর্ঘ কারাবাস।
এক মাস সাত দিন আমি কারাগারে বন্দি ছিলাম। প্রতিবার আদালতে হাজিরার দিন বিএনপি ও জামায়াতপন্থী প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন আইনজীবী আমার পক্ষে দাঁড়াতেন। কারন তৎকালীন সময়ে অবিভক্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা ভাই গুরুত্বদিয়ে আমাকে মুক্ত করার জন্য মাদারীপুর জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ কে অনুরোধ করেছিলেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা মামলার বিপক্ষে অবস্থান নিতেন। এই কারণে মামলাটি স্থানীয়ভাবে বহুল আলোচিত রাজনৈতিক মামলায় পরিণত হয়। হাজতে থাকার সময় আমার পরিচয় হয় মাদারীপুরের প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা জয়নাল ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি আমাকে সাহস জোগান এবং কারাগারে থাকা তাঁর ভাই কবির মাতুব্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কারাগারের কঠিন দিনগুলোতে তাঁদের সহযোগিতা আমাকে মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতে সহায়তা করে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষ হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর আমি আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাই।
কারাগারের ফটকে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন ডাকসুর সাবেক ভিপি ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ বোরহানউদ্দিন ভাই। তিনি নিজে আমাকে গাড়িতে করে ঢাকার তেজগাঁওয়ের বাসায় পৌঁছে দেন। সেই সময় আমি তাঁতী দল ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক এবং তেজগাঁও থানা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করি।
খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং পরবর্তীকালে সরকারের হুইপ মরহুম জননেতা আশরাফ হোসেন আমার আবেদনে সুপারিশ করেন। পরবর্তীতে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয় এবং আমি সেই অভিযোগ থেকে মুক্তি লাভ করি। সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা আমাকে বদলে দেয় অপহরণ, মৃত্যুভয়, কারাবাস এবং রাজনৈতিক নির্যাতনের স্মৃতি আমাকে উপলব্ধি করায়- গুম ও জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া কোনো পরিবারের জন্য কতটা ভয়াবহ।
সম্ভবত এই অভিজ্ঞতাই আমাকে পরবর্তীকালে গুম ও জোরপূর্বক নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
এছাড়াও ২০০০ সালে বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব হিসাবে অধিকার এর পক্ষে লড়াই শুরু করি।
২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানা বিএনপির নেতা সাবেক ৩৮ বর্তমান ২৫ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন সহ ৮ জন গুমের শিকার হয়েছেন। ৬ দিন পর ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির ব্যানারে গুম এর শিকার সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ ৮ জন এর ছবি সহ গুমের শিকার সবাই কে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে প্রথম মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছিলাম। সেই কর্মসূচিতে প্রয়াত জননেতা শফিউল আলম প্রধান, বর্তমান বিএনপির চেয়ারম্যান এর উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব সহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
২০১৪ সাল থেকে ভিকটিম ৮ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শুরু হলো নতুন আন্দোলন। একে একে সব ভিকটিম পরিবারের সদস্যরা যুক্ত হলো। আর সৃষ্টি হলো ঐতিহাসিক সংগঠন মায়ের ডাক। “মায়ের ডাক”-এর সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি আমার ব্যক্তিগত বেদনা, মানবিক দায়বদ্ধতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ।
আমার জীবনের সেই কঠিন সময়ে যাঁরা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের প্রতি আমি আজীবন কৃতজ্ঞ। বিশেষভাবে স্মরণ করছি প্রবীণ রাজনীতিবিদ বোরহানউদ্দিন ভাই, সাবেক এমপি বাচ্চু ভাই, যুবনেতা মুরাদ ভাই, অ্যাডভোকেট আব্দুল হাই, অ্যাডভোকেট জাফর ভাই, কুলবুদ্দিন জাহানদার আলী, শ্রমিক নেতা জয়নাল ভাই, কবির মাতুব্বর এবং কালকিনীর কৃতী সন্তান যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা মাশুক চৌধুরীসহ অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীকে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু কোনো মতপার্থক্যই যেন একজন নাগরিকের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার কারণ না হয়।
আমি বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপহরণ, গুম, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। ইতিহাসের বেদনাদায়ক ঘটনাগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন—প্রতিশোধের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন শিক্ষা নেয় এবং বাংলাদেশে আর কখনো কোনো মানুষ রাজনৈতিক কারণে অপহরণ, গুম, নির্যাতন কিংবা মিথ্যা মামলার শিকার না হন।
লেখক: মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা
চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি