বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র | স্বাধীনতার মূল মন্ত্র ছিল বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক মুক্তি ও গণতন্ত্র অন্যতম | একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনই টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই সরকারি চাকরিজীবী এবং তাঁদের পরিবারের সম্পদের হিসাব নিয়মিতভাবে নেওয়া ও নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় জনসম্মুখে প্রকাশের ব্যবস্থা করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
সরকারি চাকরি মূলত জনগণের সেবা করার দায়িত্ব। একজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রাষ্ট্রের কাছ থেকে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পান জনগণের করের অর্থ থেকে। ফলে তাঁর আয় ও সম্পদের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে অনেক সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে দায়িত্বের বাইরে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন, ঘুষ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কার্যকর ও নিয়মিত সম্পদ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিধান ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের দাখিল করা সম্পদের হিসাব বিবরণী সংরক্ষণ ও ডেটাবেজ হালনাগাদ করার কার্যক্রম রয়েছে। ২০২৪ সালেও সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিষয়ে নোটিশ জারি করা হয়েছিল।
কিন্তু শুধু কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পদের বিবরণী জমা দিলেই হবে না। প্রয়োজন তথ্যের যথাযথ যাচাই, নিয়মিত হালনাগাদ এবং জনগণের কাছে প্রয়োজনীয় মাত্রায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। সরকারি কর্মচারীর নিজের পাশাপাশি তাঁর স্বামী বা স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে মা বাবা শশুর শাশুড়ি নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা উল্লেখযোগ্য সম্পদও আইনি কাঠামোর মধ্যে বিবেচনায় আনা যেতে পারে। তবে কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রেখে কোন তথ্য প্রকাশযোগ্য এবং কোন তথ্য সংরক্ষিত থাকবে—তা স্পষ্ট আইন ও নীতিমালার মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত।
প্রতি বছর সম্পদের হিসাব নেওয়ার পাশাপাশি আগের বছরের তুলনায় সম্পদ কতটা বেড়েছে, সেই বৃদ্ধির অর্থের উৎস কী এবং আয়-ব্যয়ের সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না সেটিও যাচাই করা দরকার। বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি, গাড়ি, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, ব্যাংক আমানত, শেয়ারসহ উল্লেখযোগ্য সম্পদের তথ্য যাচাইয়ের আওতায় আনা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে আয়কর কর্তৃপক্ষ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তথ্যের মধ্যে সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে।
এ ব্যবস্থা চালু হলে সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেমন অযথা সন্দেহ ও হয়রানি থেকে সুরক্ষা পাবেন, তেমনি অবৈধ সম্পদ অর্জনকারীদের শনাক্ত করাও সহজ হবে। সম্পদের হিসাব প্রকাশের সম্ভাবনা একজন দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তির জন্য একটি কার্যকর প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বাড়বে।
তবে সম্পদ প্রকাশের ব্যবস্থা যেন প্রতিহিংসা, রাজনৈতিক হয়রানি কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহানির হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও কঠোর নজর রাখতে হবে। অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না; স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হবে।
বাংলাদেশের দ্রুত ও টেকসই উন্নয়নের জন্য দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে যদি আয় ও সম্পদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, সরকারি অর্থের অপচয় কমে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ে এবং জনগণের সেবার মান উন্নত হয়। তাই সরকারি চাকরিজীবীদের বার্ষিক সম্পদের হিসাব গ্রহণ, তথ্যের ডিজিটাল সংরক্ষণ, সম্পদের উৎস যাচাই এবং আইনসম্মতভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ এই চারটি বিষয়কে একটি সমন্বিত নীতির আওতায় আনা যেতে পারে।
সরকারি কর্মচারী মানেই সন্দেহের চোখে দেখা নয়; বরং প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটি শক্তিশালী কাঠামোর মধ্যে রাখা। এই নীতি বাস্তবায়িত হলে সৎ কর্মকর্তারা সম্মানিত হবেন, দুর্নীতিবাজরা চাপে পড়বেন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ও লুটপাট অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। আর দুর্নীতি কমলে দেশের উন্নয়ন হবে আরও দ্রুত, টেকসই ও জনকল্যাণমুখী।
সুতরাং এখন সময় এসেছে সম্পদের হিসাব শুধু নেওয়া নয়, হিসাব যাচাই করা এবং আইনসম্মতভাবে জনগণের সামনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।তাই আমরা আশা করব সরকার দুর্নীতি বন্ধ করতে চাইলে এই ব্যবস্থাটি গ্রহণ করা দরকার |