মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়ি এলাকায় ইয়াবাসহ মোঃ সোহেল রানা নামে এক চিহ্নিত মাদক কারবারিকে হাতেনাতে আটক করেছে স্থানীয় জনতা। পরে ক্ষুব্ধ জনতা তাকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। এ সময় মাদক চক্রের অন্যতম হোতা মোঃ আদিল হোসেন পালিয়ে গেলেও তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি ভাঙচুর করে এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এলাকাবাসী গত রাত সাড়ে ১০টার দিকে সোহেল রানার বাড়ির আশেপাশে অবস্থান নেয়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর দুজন মাদকসেবী মোঃ রাহিম ও মোঃ মামুন সেখানে আসলে সোহেল রানা তাদের দুটি ইয়াবা দেয়। এ সময় স্থানীয়রা তাদের হাতেনাতে আটক করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সোহেল রানা ও তার সরবরাহকারী আদিল হোসেন দৌড়ে ঘরের ভেতর অবস্থান নেয়। জনতা তাদের ধরার চেষ্টা করলে আদিল ঘরের পেছনের জানালা ভেঙে মাদকসহ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে সোহেল রানাকে ধরে ফেলে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী এবং তাকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
এলাকাবাসী জানান, যুবসমাজ ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষায় তারা ‘তেওতা সমাজ কল্যাণ ও মাদক বিরোধী পরিষদ’ নামে একটি কমিটি গঠন করে গত ২০ দিন ধরে এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে আসছেন। মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তারা বেপরোয়া হয়ে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। এমনকি সাধারণ মানুষকে ভয় দেখাতে কয়েকদিন আগে এই সোহেল ও আদিল বড় একটি দা হাতে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে এলাকায় মহড়াও দেয়। তাদের এমন বেপরোয়া কার্যকলাপে বাধ্য হয়ে এলাকাবাসী ‘হয় মাদক কারবারি থাকবে, নয়তো আমরা থাকব’ মর্মে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। এর আগে পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ইউএনও এবং শিবালয় থানায় লিখিতভাবে বিষয়টি অবহিত করেছিলেন স্থানীয়রা।
জনতার জিজ্ঞাসাবাদে আটক সোহেল রানা তার মাদক ব্যবসার নেপথ্যের কুশীলবদের নাম প্রকাশ করে। সে অকপটে স্বীকার করে যে, তেওতার যুবদলের ১নং যুগ্ম আহ্বায়ক ও আহ্বায়ক সদস্য শিবালয় থানা যুবদল নেতা মোঃ আরিফুল ইসলাম আরিফ ও তার ছোট ভাই আদিল তাকে মাদকের চালান সরবরাহ করে। সোহেলের দাবি, গত রাতেও এরা সহ কয়েকজন তার বাসায় এসে তাকে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেয় এবং আদিল তাকে ব্যবসার জন্য ১ লাখ টাকা পুঁজিও দিয়েছে।
সোহেল আরও জানায়, এই চক্রের পেছনে বড় প্রভাবশালী মহল জড়িত, যাদের নাম বললে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হতে পারে। তা সত্ত্বেও সে যুবদল কর্মী মোঃ শফিকুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ কর্মী মোঃ জাকির হোসাইন, মোঃ ইসমাইল, মোঃ আবির মিয়া, মোঃ রেজাউল মিয়া, মোঃ টিটু শেখ, শ্রী সঞ্জয়, যুবদল কর্মী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম ও মোঃ আলমগীর, মোঃ মিন্টু গাজী, মোঃ গনি কাজী, মোঃ মানিক মোল্লা সহ বেশ কয়েকজনের নাম প্রকাশ করে।
এদিকে, আটকের পর সোহেলের মুঠোফোন চেক করে তার কললিস্টে চঞ্চল মাহমুদ নামে এক সাংবাদিকের নাম দেখা যায়। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওই নম্বরে কল করা হলে তার স্ত্রী ফোন রিসিভ করে জানান তিনি বাড়িতে নেই। এছাড়া আটক সোহেল অন্য যাদের নাম উল্লেখ করেছে, তাদের বক্তব্য জানতেও মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, আদিল হোসেন পুলিশের সোর্স পরিচয়ে প্রশাসনের কিছু ব্যক্তির সাথে আঁতাত করে দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারিদের মদদ দিয়ে আসছে।
আটককৃতের বক্তব্যে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকর্মীর নাম উঠে আসায় এ বিষয়ে আজ সকালে তেওতা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ আঃ রাজ্জাক ও সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মাজেদ মিয়ার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তারা বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেন, “অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধীদের কোনো দল নেই। আটককৃত আসামি যাদের নাম বলেছে, সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর দলীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” এলাকাবাসীর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তারা আরও বলেন, “মাদক নির্মূলে আমরা আপনাদের সাথে আছি এবং আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা আপনারা পাবেন।”
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় শিবালয় থানার ওসি মহোদয়ের এমন তড়িৎ পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এলাকাবাসী। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করে বলা হয়, আসামির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আদালতে পাঠানো হবে এবং উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি জনগণকে আইন নিজেদের হাতে তুলে না নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে পুলিশ জানায়, এলাকাবাসী সোচ্চার হলেই সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব।
দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত সোহেলকে এর আগেও একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। এলাকাবাসী জোর দাবি জানান, সোহেল যাদের নাম বলেছে, সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক তারা দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধেও দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তেওতায় কোনো মাদক কারবারির ঠাঁই হবে না। পরবর্তীতে মাদক কারবারিরা যদি হুমকি দেয়, কারও ক্ষতি বা মামলা দায়ের করার চেষ্টা করে, এমনকি এদের পক্ষে কেউ যদি তদবির করার চেষ্টা করে, তবে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে এলাকা থেকে চিরতরে বিতাড়িত করা হবে। এছাড়া মাদক কারবারি ও তাদের পরিবারকে সামাজিকভাবে বয়কট করার ঘোষণা দেওয়া হয়। সমাজে তাদের কোনো ঠাঁই হবে না এবং স্থানীয় কোনো ইমাম তাদের জানাজা, বিয়ে, মিলাদসহ সামাজিক বা ধর্মীয় কোনো কাজে শরিক হবেন না বলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিশেষে এলাকাবাসী দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “এক আল্লাহ ছাড়া আমরা কাউকে ভয় করি না। সমাজে যেকোনো অন্যায় দেখলে তা রুখতে আমরা একজোট হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব, ইনশাআল্লাহ।