ফরিদপুরের ভাঙ্গায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের একটি শাখায় ঋণ বিতরণ ও কিস্তির অর্থ আদায় নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মনোয়ার হোসেন এবং মাঠ সহকারী ফজলুল হক ওরফে রুবেল মাতুব্বরের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের নামে ভূয়া ঋণ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং কিস্তির টাকা গ্রহণের পর তা ব্যাংকে জমা না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
অভিযুক্ত সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মনোয়ার হোসেন বর্তমানে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন। অপর অভিযুক্ত মাঠ সহকারী ফজলুল হক ওরফে রুবেল মাতুব্বর বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের আওতায় ভাঙ্গা শাখার ঋণ কার্যক্রমে নানা অনিয়ম হয়েছে। ২০২১ সালের জুন মাসে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এর কার্যক্রম পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, উপজেলার চুমুরদী ইউনিয়নের পূর্ব সদরদী গ্রামের প্রায় অর্ধশত গ্রাহক নিয়মিতভাবে মাঠ সহকারী রুবেল মাতুব্বরের কাছে ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু ওই টাকা ব্যাংকে জমা না দেওয়ায় বর্তমানে তাদের অনেকের নামেই বকেয়া ঋণ দেখানো হচ্ছে।
ঋণের আবেদন না করেও ৭০ হাজার টাকা ঋণ!
ভুক্তভোগী হোসনেয়ারা বেগমের অভিযোগ, তিনি কখনো ঋণের জন্য আবেদন করেননি এবং ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের সদস্যও ছিলেন না। অথচ তার নামে ৭০ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ দেখানো হয়েছে।
হোসনেয়ারা বেগম বলেন,“আমি ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের সদস্যই নই। কখনো ঋণের আবেদনও করিনি। অথচ আমার নামে ৭০ হাজার টাকার ঋণ দেখানো হয়েছে। বিষয়টি জানতে অফিসে গেলে কোনো কাগজপত্র দেখানো হয়নি। উল্টো আমাকে ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছি।”
তার এলাকার কর্মসূচির দলনেতা হাজেরা বেগম বলেন, “হোসনেয়ারা আমাদের দলের সদস্যই না। সদস্য না হলে ঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই। তার নামে কীভাবে ঋণ হলো, কে টাকা তুলেছে—আমরা কিছুই জানি না।”
টাকা পরিশোধ করেও বকেয়া!আরেক ভুক্তভোগী আলেয়া বেগম বলেন, “আমি ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছি। এখন অফিস থেকে বলা হচ্ছে, আমার কাছে এখনও ৫০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। আমরা গরিব মানুষ, কাগজপত্র তেমন বুঝি না। অনেক কষ্ট করে ঋণ শোধ করেছি, আবার কীভাবে এত টাকা দেব?”
ভুক্তভোগী মমতাজ বেগমের অভিযোগ, তিনি ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে রুবেল মাতুব্বরের মাধ্যমে পুরো টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু রুবেল চলে যাওয়ার পর ব্যাংক থেকে তাকে জানানো হচ্ছে, তার নামে এখনও ৫০ হাজার টাকা বকেয়া রয়েছে।
আবেদনপত্র দেখাতে অস্বীকৃতি অভিযোগের বিষয়ে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক সুশান্ত কুমার দাস বলেন, “ঋণের আবেদনে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে হোসনেয়ারা বেগমের স্বাক্ষরের মিল পাওয়া গেছে।”
তবে ওই ঋণের আবেদনপত্র দেখানোর অনুরোধ করা হলে তিনি তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান।
গ্রাহকদের দাবি অনুযায়ী ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধের পরও তাদের নামে বকেয়া দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওই সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না। তাই বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না।”
মাঠ সহকারী ফজলুল হক ওরফে রুবেল মাতুব্বরের বিষয়ে বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক বলেন, “তাকে ফরিদপুরে সংযুক্ত করা হয়েছিল। তবে তিনি সেখানে যোগদান করেননি।”
সাবেক ব্যবস্থাপকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মনোয়ার হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তদন্তের আশ্বাস ইউএনওর ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, “‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের ঋণ বিতরণে কিছু অসঙ্গতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগে বলা হয়েছে, ঋণ পরিশোধ করার পরও অনেকের নামে অনাদায়ী ঋণ দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের সদস্য নন—এমন ব্যক্তির নামেও ঋণ বিতরণের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ভুক্তভোগীদের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে তাদের নামে থাকা অনিয়মতান্ত্রিক বকেয়া ঋণ বাতিল এবং কিস্তির অর্থের হিসাব যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।