চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষকের (সিএফ) কার্যালয়ে কর্মরত হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ ইউছুপের বিরুদ্ধে বদলির সরকারি আদেশ উপেক্ষা করে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় একই কার্যালয়ে বহাল থাকার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধীন বিভিন্ন বন বিভাগে বদলি, পদায়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়, চাঁদাবাজি এবং বদলি বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে।
বদলির আদেশ কার্যকর হয়নি
তথ্যসূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক বন সংরক্ষক বিপুল কৃষ্ণ দাস ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে এক অফিস আদেশের মাধ্যমে মোহাম্মদ ইউছুপকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে বদলি করেন। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি ওই কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে সিএফ কার্যালয়েই বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সিএফ বিপুল কৃষ্ণ দাস অন্যত্র বদলি হওয়ার পর ইউছুপের বদলির আদেশটি কার্যকর না হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এমনকি ওই আদেশের নথি সরিয়ে ফেলা এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের দাপ্তরিক ই-মেইল থেকেও আদেশের কপি মুছে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে দক্ষিণ বন বিভাগে কর্মরত এক অফিস সহকারী বিষয়টি জানেন বলে সূত্র দাবি করেছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সূত্রের দাবি, পরবর্তীতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরও দুইজন বন সংরক্ষকের দায়িত্বকাল শেষ হলেও ইউছুপ একই কার্যালয়ে বহাল রয়েছেন। এ নিয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়েছে।
মাসোহারা ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধীন বিভিন্ন ডিভিশন ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ না দিলে হয়রানি কিংবা বদলির হুমকি দেওয়া হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন ডিভিশনের শহর রেঞ্জ, সদর রেঞ্জ ও চেক স্টেশন থেকে মাসিক ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। এছাড়া বান্দরবান, পাল্পউড প্ল্যান্টেশন ও লামা বন বিভাগের জোত পারমিটের ক্ষেত্রেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অর্থ লেনদেনের বিষয়ে কোনো লিখিত নথি বা স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
এদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, কাঙ্ক্ষিত বা সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলির জন্যও ইউছুপের মাধ্যমে তদবির করতে হয়। এ কারণে তাকে সিএফ কার্যালয়ের ‘অঘোষিত ক্যাশিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করছেন কেউ কেউ।
বদলি নীতিমালা নিয়েও প্রশ্ন
বন অধিদপ্তরের বদলি নীতিমালা অনুযায়ী কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের নির্ধারিত সময়সীমা নিয়ে বিধান থাকলেও, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন ডিভিশনে দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাবশালী বা সুবিধাজনক কর্মস্থলে থাকা কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দীর্ঘদিন একই জায়গায় রাখার ক্ষেত্রে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। অন্যদিকে দুর্গম এলাকায় কর্মরত অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন।
তাদের অভিযোগ, অর্থ ও প্রভাবের ভিত্তিতে কেউ সুবিধাজনক কর্মস্থলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বর্তমান সিএফের আমলেও চলছে কি?
অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমান চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো-এর দায়িত্বকালেও বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে ইউছুপের প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, সাবেক বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিমের সময়ও ইউছুপকে দীর্ঘদিন একই কার্যালয়ে রাখার পেছনে বিশেষ সুবিধা ছিল। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এসব অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ ইউছুপের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন সংযোগ পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো-এর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকেও পাওয়া যায়নি।
তদন্তের দাবি
ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই কার্যালয়ে বহাল থাকার বিষয়টি তদন্তের পাশাপাশি বদলির আদেশ কেন কার্যকর হয়নি, সরকারি নথি বা ই-মেইল থেকে কোনো নথি সরানো বা মুছে ফেলা হয়েছে কি না এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা—সবকিছুই তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের আরও দাবি, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তা তদন্ত করা হোক।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।