সজল কুমার মিত্র—দেশের মিডিয়া জগতে যিনি অধিক পরিচিত ‘সজল মিত্র রিচার্ড’ নামে। এককথায় বললে, তিনি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সংবাদ উপস্থাপক, গীতিকার, লেখক, সাংবাদিক এবং ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার। আধুনিক সময়ে তার নাম উঠে আসে যখন কোনো খবরের পর্দায় উপস্থাপনার কথা আসে। কিন্তু বর্তমানে তিনি নিভৃতে রয়েছেন, জনসম্মুখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। তিনি কোথায় আছেন, কী করছেন বা কেন নিজেকে গোপন করেছেন—এসব নিয়ে অনেক প্রশ্ন থেকেই যায়। সম্প্রতি একটি ইন্টারনেট কলের মাধ্যমে তাকে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় এবং সেখান থেকে জানা গেলো তার ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা ও অভিজ্ঞতা।
সজল কুমার মিত্রের পুরো নাম এবং পরিচিতি ‘সজল মিত্র রিচার্ড’। সময় সংবাদ এবং সময় টেলিভিশনে তার কাজের গুণমান, জনপ্রিয়তা এবং দক্ষতা বাংলাদেশের মিডিয়ার এক স্বীকৃত নাম। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় খবর, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ, ক্রীড়া সংবাদ উপস্থাপনা, সবক্ষেত্রে তার পারদর্শিতা নজর কেড়েছে। দেশের সর্বত্র তার সংবাদ উপস্থাপনার ভক্ত রয়েছে। আধুনিক টেলিভিশন যুগে যেখানে প্রচুর চ্যানেল এবং সংবাদ উপস্থাপক রয়েছেন, সেখানে সজল মিত্রের উপস্থাপনা এমন এক শিল্পের রূপ নিয়েছিল যা অনেকের নজর কেড়েছে।
কিন্তু দীর্ঘদিন যাবত তিনি বিভিন্ন কারণেই নিজেকে গোপন রেখেছেন। অনেক চেষ্টার পরও তাকে পাওয়া কঠিন ছিল। ইন্টারনেট কলে যোগাযোগের সময় তিনি জানালেন যে বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন এবং আগের মতো সবার সামনে ফিরে আসার ইচ্ছা তার নেই। এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তার জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়ে এসেছে। ওই দিন তিনি সময় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারে ছিলেন যখন দেশব্যাপী একটি গুরুতর ঘটনায় সময় টেলিভিশনের অফিসে হামলা হয়। তিনি অফিস থেকে ফায়ার এক্সিট দিয়ে নিরাপদ স্থানে বের হতে পেরেছিলেন। এরপর ছাত্রদের আন্দোলনকে তিনি সমর্থন করলেও মৌলবাদী গোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
গত বছর অক্টোবর মাসে বরগুনায় পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার সময় তিনি একটি সশস্ত্র হামলার শিকার হন এবং মুগদা হাসপাতালে দুদিন ভর্তি থাকতে হয়। এরপর থানায় মামলা হলেও প্রশাসন থেকে বিশেষ কোনও সহযোগিতা পাননি-সজল। নভেম্বর মাসে রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত এলাকায় কাকরাইলে মোটরবাইকসহ আরেকটি হামলার ঘটনা ঘটে, এই সময় পুলিশ সহযোগিতাও করেনি। এ সব কারণে তার প্রতি সামাজিক ও রাজনৈতিক সমালোচনা বেড়েছে। কিছু সময় ধরে তার নাম বিভিন্ন অপবাদ এবং ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগের মধ্যেও এসেছে, যার ফলে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিএমএম কোর্টে মামলা হয়।
সজল ২০১০ সালে ক্যারিয়ার শুরু করেন দেশের প্রথম প্রাইভেট রেডিও স্টেশন রেডিও টুডেতে (এফএম ৮৯.৬) আরজে হিসেবে। সেই সময় থেকেই ‘রিচার্ড’ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করেন। রেডিও টুডের ম্যানেজমেন্ট তার জন্য এই নাম দিয়েছিল এবং সেটিই তার ডাকনাম হয়ে ওঠে। গীতিকার হিসেবে তিনি সফল হয়েছেন, বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন এবং নিজেই বিভিন্ন সময়ে গেয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই গান করার প্রবৃত্তি থাকায় মিউজিক ভিডিও বানিয়েছেন এবং জনপ্রিয় গানের কাভার করে শ্রোতাদের কাছে প্রশংসা অর্জন করেছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের হার্টথ্রব নায়ক সালমান শাহ’র অভিনীত মুভির গান কাভার করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।

তার ব্যক্তিত্বের আরেক দিক হলো যুক্তিবাদী ও বিতর্কপ্রিয়তা। স্কুল-কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সক্রিয় ছিলেন। একাধিকবার টেলিভিশনে বিতর্ক প্রতিযোগীতায় চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য হয়েছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে শ্রেষ্ঠ বক্তা হিসেবে সম্মানও পেয়েছেন।
২০১৩ সালে দেশের স্বনামধন্য সময় টেলিভিশনে যোগদান করে তিনি তার ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায় শুরু করেন। সেখানে তিনি সংবাদ উপস্থাপনার ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন এবং ১২ বছর ধরে দেশের মানুষ তার প্রতিভা উপভোগ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটের বর্ণনা, ক্রীড়া সংবাদ—সব ক্ষেত্রেই তার উপস্থাপনা প্রশংসিত হয়েছে। ২০১৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে তার ধারাভাষ্য তাকে দেশের মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে। বিশেষ করে সাকিব আল হাসানের বিশ্বকাপ কীর্তি বর্ণনায় তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান।
সজল মিত্র পেশাগতভাবে একজন মার্কেটিং ও কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ। তিনি শিক্ষা জীবনে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন, স্কুল, কলেজের পাঠক্রম সম্পন্ন করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন ও মাস্টার্স অব বিজনেস স্টাডিজ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এরপর পারটেক্স স্টার গ্রুপে যোগ দিয়ে ড্যানিশ ফুডস লিমিটেডের ব্র্যান্ড ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন এবং পরে টিম গ্রুপে মার্কেটিং ও ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
সামাজিক কাজে তিনি বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। প্রথম আলো বন্ধুসভা, ব্ল্যাডম্যান (রক্তদানকারী সংগঠন), নিউজ ব্রডকাস্টার অ্যালায়েন্স (সংবাদ উপস্থাপকদের সংগঠন), বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন (ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন), এসব সংগঠনে তার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন।
যদিও এখন তিনি জনসম্মুখ থেকে অনেকটাই দূরে, সজল মিত্রের আবেগ ও আক্ষেপ স্পষ্ট। তার চক্ষু ঝলমল করলেও তিনি নিজেকে আপাতত নিভৃত রেখেছেন। তার একমাত্র প্রত্যাশা পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখে শান্তিতে থাকুক। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক সন্তানের জনক, এবং পরিবারের জন্য দোয়া চেয়েছেন। তার কাঁধে দেশের সংবাদ উপস্থাপনার অনেক স্মৃতি আর সংগ্রাম জড়িয়ে রয়েছে, যা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।
সজল কুমার মিত্র, নিভৃত প্রাকাশিত সেই জলন্ত প্রদীপ, আজও দেশের মিডিয়া পাড়ায় আলো ছড়াচ্ছেন তার স্মৃতি ও অবদান দিয়ে। ভবিষ্যতে তার ফেরার প্রত্যাশা ভক্তদের মনে থেকে যাবে, তবে এখন তিনি শান্তি ও সুরক্ষার মাঝে নিজেকে গুঁটিয়ে রেখেছেন।