উন্নয়ন, নাগরিক সেবা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে অগ্রাধিকার; ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় আধুনিক নগরী গড়ার প্রত্যয় প্রশাসক সাখাওয়াতের
নতুন কোনো কর আরোপ না করেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০ কোটি ৯৯ লাখ ৭৫ হাজার ১১২ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, সুপেয় পানির সরবরাহ, মশক নিয়ন্ত্রণ, খাল পুনরুদ্ধার, জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রণীত হয়েছে এ বাজেট।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টায় নগর ভবনের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেট ঘোষণা করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। এটি নাসিকের ১৫তম বাজেট এবং প্রশাসক হিসেবে তাঁর প্রথম বাজেট উপস্থাপন।
গত অর্থবছরে নাসিকের বাজেট ছিল ৭৭৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সে তুলনায় এবার বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঘোষিত ৮৭৯ কোটি টাকার বাজেট ছিল সর্বোচ্চ।
বাজেট ঘোষণাকালে জানানো হয়, এবারও নাগরিকদের ওপর কোনো নতুন কর আরোপ করা হয়নি। বরং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে ছাদবাগান মালিকদের জন্য বিদ্যমান ২৭ শতাংশ গৃহকর ছাড়ের সঙ্গে অতিরিক্ত আরও ২ শতাংশ ছাড় যুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নূর কুতুবুল আলম।
তিনি জানান, এবারের বাজেটে নাগরিক ভোগান্তি কমানোর বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। সুপেয় পানির সরবরাহ বৃদ্ধি, মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার, খাল খনন ও পুনরুদ্ধার, জলাবদ্ধতা নিরসন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বাড়তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নগরবাসীর সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে একাধিক খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৩০ কোটি টাকা। পাশাপাশি ১৩০ কোটিরও বেশি উদ্বৃত্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাজেটের অর্থায়নের বিষয়ে প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, নিজস্ব রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও মোট আয়ের প্রায় ৫২ শতাংশ বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট উন্নয়ন প্রকল্প থেকে আসবে। অন্যদিকে মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ একই ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হবে।
তিনি বলেন, রাজস্ব আদায় আরও কার্যকর করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাজস্ব খাতের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া পানি সরবরাহ খাতের আয়, সরকারি উন্নয়ন সহায়তা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকেও বাজেট বাস্তবায়নের অর্থ আসবে।
বাজেট বক্তৃতায় প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, অতীতে রাজনৈতিক বিভাজন ও নানা টানাপোড়েনের কারণে নারায়ণগঞ্জ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে বর্তমানে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “আমরা অতীতের বিভক্তির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসেছি। এখন প্রয়োজন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন, আধুনিক, বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ গড়ে তোলা। ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নাগরিক সুবিধার দিক থেকে এই নগরীকে দেশের অন্যতম মডেল শহরে পরিণত করতে আমরা কাজ করব।”
প্রশাসক আরও বলেন, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁকে নাসিকের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তিনি সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, উন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলা সম্ভব।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, আরাফাত রহমান কোকো, মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নিহত ব্যক্তি এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে নাসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব নূর কুতুবুল আলম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আজগর হোসেন এবং প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হেমায়েত হোসেন মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নগর পরিকল্পনাবিদ মঈনুল ইসলাম।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান, জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাসুকুল ইসলাম রাজীব, জামায়াতে ইসলামীর মহানগরীর সাবেক আমির মাওলানা মইনুদ্দিন আহমাদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা সহসভাপতি মুফতি মাছুম বিল্লাহসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
নতুন অর্থবছরের এই বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিক সেবার মান উন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নারায়ণগঞ্জ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্টরা।