টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে নেমে এসেছে পাহাড়ধসের বিভীষিকা। রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ও কক্সবাজার শহরে পৃথক পাঁচটি পাহাড়ধসের ঘটনায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।
সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে রাত দেড়টার দিকে উখিয়ার জামতলী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৫) ডি-৬ ব্লকে। পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে কামাল হোসেনের বসতঘরের ওপর। ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়ে মারা যান কামাল হোসেন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমাইরা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস। এ ঘটনায় পরিবারের আরও দুই সদস্য আহত হন। তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এর কিছুক্ষণ পর রাত দুইটার দিকে কুতুপালংয়ের ৭ নম্বর আশ্রয়শিবিরের ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ধসে মারা যায় সাত বছর বয়সী একরাম। সে রশিদ উল্লাহর ছেলে।
রাত সাড়ে তিনটার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর আশ্রয়শিবিরের সি-১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজন নিহত হন। নিহতরা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তাঁর বোন তানজিনা আক্তার (১৩) এবং দুই ভাই রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় মোট আটজনের মৃত্যু হয়েছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের দুটি উদ্ধারকারী ইউনিট, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালান। তবে টানা বৃষ্টি, কাদা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের কারণে উদ্ধারকাজ ছিল অত্যন্ত কঠিন।
অন্যদিকে সোমবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে কক্সবাজার শহরের সাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে নিহত হন আলী আকবর (৫০)। পাহাড়ের মাটি ধসে তাঁর বসতঘর চাপা পড়লে তিনি ও পরিবারের আরও দুই সদস্য আটকা পড়েন। স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের অপর দুই সদস্য চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে মাইকিং করে সতর্কবার্তাও প্রচার করা হচ্ছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে জেলাজুড়ে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। সোমবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি আরও অন্তত দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলেও তিনি জানান।
প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা এবং রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে পাহাড় কেটে বা খাড়া ঢালে নির্মিত বসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। টানা বর্ষণে মাটি আলগা হয়ে গেলে মুহূর্তের মধ্যেই পাহাড় ধসে পড়ে, আর গভীর রাতে ঘুমন্ত মানুষের জন্য তা হয়ে ওঠে এক মরণফাঁদ।