প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কেন্দ্রীয়ভাবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির ৩য় পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন কার্যক্রমের মাধ্যমে গাজীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ৬৮০ জন নারী ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন।
সবুজ শালবনের বুক চিরে মেঠো পথ ধরে এগিয়ে গেলে দেখা মেলে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল মাওনা ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের শিমলাপাড়া, আটলাপাড়া, শিরিশ খরা ও বদনীভাঙ্গা গ্রামের। চারদিকের অরণ্যে ঘেরা নিস্তব্ধ এই জনপদে বাস করেন উপজেলার সবচেয়ে অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা। তবে সেখানে বইছে আনন্দের জোয়ার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অগ্রাধিকার প্রকল্প ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এই প্রান্তিক জনপদের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়ায় যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে কেন্দ্রীয়ভাবে এই কর্মসূচির ৩য় পর্যায়ের উদ্বোধন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গাজীপুরের শ্রীপুরে জেলায় প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হলো। প্রথম ধাপে মাওনা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ৬৮০ জন যোগ্য নারীকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করে তাদের হাতে এই ডিজিটাল ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হয়েছে।
সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বহুল প্রত্যাশিত এই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ উপলক্ষে বিকেলে বদনীভাঙ্গা হান্নান জনসেবা সংঘ মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নারীদের হাতে কার্ড তুলে দেন গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ডাক্তার রফিকুল ইসলাম বাচ্চু।
অনুষ্ঠানে ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ গ্রহণ করেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ নূরুল করিম ভূঁইয়া। তিনি প্রান্তিক নারীদের হাতে কেবল কার্ড তুলেই দেননি বরং এই ডিজিটাল কার্ডের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে সরাসরি তাদের সাথে কথা বলেন। অত্যন্ত সহজ ভাষায় তিনি গ্রামীণ নারীদের শিখিয়ে দেন কীভাবে কার্ডের ব্যালেন্স চেক করতে হয় এবং মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজের আর্থিক হিসাব রাখা যায়। জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার কাছ থেকে সরাসরি প্রযুক্তির এমন পাঠ পেয়ে নারীদের মধ্যে ব্যাপক আত্মবিশ্বাস লক্ষ করা গেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর এই ওয়ার্ডটিতে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান না থাকায় এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মান বেশ নিম্নমুখী। এই অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিশেষ সুপারিশে পাইলট প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে এই ওয়ার্ডটিকে নির্বাচন করা হয়। এরপরই জেলা সমাজসেবা বিভাগ মাঠপর্যায়ে জরিপ কার্যক্রম শুরু করে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন ও শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এবারই প্রথম কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই জরিপ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার বা অন্য কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়নি। এমনকি গত ঈদুল আজহার ছুটি ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের জেলা ও জেলার সকল উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা, সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা, সকল ফিল্ড সুপারভাইজার ও ইউনিয়ন সমাজকর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাঠপর্যায়ের জরিপ এবং ঈদের পর তা পুনরায় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেন। ফলে কোনো স্বজনপ্রীতি ছাড়াই প্রকৃত অসচ্ছল ও যোগ্য পরিবারের নারীরাই এই সুবিধা পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রত্যেক কার্ডধারী নারী প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে পাবেন, যা সরাসরি তাদের মোবাইল ব্যাংকিং বা সুবিধাজনক ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে যাবে।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই অগ্রাধিকার প্রকল্প প্রান্তিক মানুষের পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বদনীভাঙ্গার এই মা-বোনদের মুখের হাসিতেই প্রকৃত উন্নয়নের প্রতিফলন ঘটেছে।
সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মূখে হাসি ফোটানো এ অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: শাহরিয়ার নজির, শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ ভূঁইয়া, গাজীপুর জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মতিউর রহমান, সহকারী পরিচালক এটিএম তৌহিদ উদ জামানসহ জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
বদনীভাঙ্গার মতো অরণ্যঘেরা গ্রামের নারীদের কাছে এই ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি প্লাস্টিকের টুকরো নয়; এটি কঠিন সময়ে সংসার চালানোর এক জাদুকরী ভরসা। নতুন কার্ড হাতে পাওয়ার পর ব্যালেন্স নিশ্চিত হতেই উপস্থিত নারীরা মেতে ওঠেন বাঁধভাঙা উল্লাসে। জেলা প্রশাসকের সাথে তাদের এই খুশি ও স্বস্তির হাসি সত্যিই মানবিক ও ডিজিটাল বাংলাদেশের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি ।