আজ বাঁশখালী উপজেলা থেকে নতুন কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বিদায় নিচ্ছি। বিদায়ের এই মুহূর্তে কিছু লিখতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে, শুধু একটি কর্মস্থল নয়—আমার নিজের একটি আপন ঠিকানা, অসংখ্য আপন মানুষের ভালোবাসায় গড়া একটি পরিবার ছেড়ে চলে যাচ্ছি।
দীর্ঘ প্রায় ১ বছর বাঁশখালী উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সরকারি দায়িত্ব পালন করতে এসে কখন যে এই জনপদের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় আমি আপনজন হয়ে উঠেছি, তা নিজেও বুঝতে পারিনি। প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং এই জনপদের একজন মানুষ হয়ে আপনাদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম ও স্বপ্নের পাশে থাকার আন্তরিক চেষ্টা করেছি।
গভীর রাতের অভিযান, মানুষের অভিযোগ শুনে তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়া, মাদক, জুয়া, ভূমি-সংক্রান্ত অনিয়ম দমন কিংবা জনস্বার্থে পরিচালিত প্রতিটি কার্যক্রমে আমার একটাই চেষ্টা ছিল—রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও ন্যায্য অধিকার রক্ষা করা। কতটুকু সফল হয়েছি, তার বিচার আপনাদের হাতেই রইল।
আমার বদলির আদেশ হয়েছিল গত ৫ জুলাই। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বাঁশখালী ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে। এমন একটি দুর্যোগের সময়ে এই জনপদ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা মন সায় দেয়নি। তাই বিদায়ের প্রস্তুতির পরিবর্তে আমি চেষ্টা করেছি আপনাদের পাশে থাকতে। উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ঘুরে ঘুরে বন্যাদুর্গত মানুষের খোঁজ নিয়েছি, সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সহযোগিতার চেষ্টা করেছি। প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। বিদায়ের প্রাক্কালে আপনাদের অসহায়ত্ব, কষ্ট আর সংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখে আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়েছে। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, বাঁশখালী খুব দ্রুত এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠে আবার স্বাভাবিক জীবন ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাক।
দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়তো কখনো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। অনেক সময় আইন, বাস্তবতা ও দায়িত্বের সীমাবদ্ধতার কারণে সবার প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। অনিচ্ছাকৃতভাবে আমার কোনো কথা, আচরণ বা সিদ্ধান্তে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। বিশ্বাস করুন, কোনো সিদ্ধান্তই ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ থেকে নেওয়া হয়নি; প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল দায়িত্ব, আইন এবং বিবেকের আলোকে সঠিক কাজটি করার আন্তরিক প্রয়াস।
আজ আমি কর্মস্থল বদল করছি, কিন্তু মানুষের ভালোবাসার কোনো বদলি হয় না। বাঁশখালীর মানুষের যে সম্মান, আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও ভালোবাসা আমি পেয়েছি, তা আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন হয়ে থাকবে। এই ভালোবাসার ঋণ কখনো শোধ করার নয়।
এই বিদায়ের মুহূর্তে গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি মাননীয় বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম মহোদয়কে, যিনি আমাকে এই উপজেলায় কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই মাননীয় জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম মহোদয়কে, যার নিবিড় তদারকি ও দিকনির্দেশনা প্রতিটি দায়িত্ব পালনে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই বাঁশখালী উপজেলার সম্মানিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাবৃন্দকে, যাদের সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা, সহযোগিতা ও আস্থার পরিবেশে আমি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, উপজেলা পর্যায়ের অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাংবাদিক, শিক্ষক, সুধীজন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সর্বোপরি বাঁশখালীর প্রতিটি সাধারণ মানুষের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা।
আমি হয়তো চলে যাচ্ছি, কিন্তু হৃদয়ের একটি বড় অংশ চিরদিন বাঁশখালীতেই থেকে যাবে। যখনই বাঁশখালীর নাম শুনব, মনে পড়বে আপনাদের ভালোবাসা, অসংখ্য পরিচিত মুখ, দায়িত্ব পালনের প্রতিটি স্মৃতি এবং এই জনপদের মানুষের অদম্য সাহস ও মানবিকতার কথা।
আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন নতুন কর্মস্থলেও একই সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, নিষ্ঠা ও মানবিকতা নিয়ে মানুষের সেবা করতে পারি। আর আমার পক্ষ থেকে বাঁশখালীর প্রতিটি মানুষের জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা ও দোয়া—এই প্রিয় জনপদ আরও শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠুক।
শেষে শুধু একটি কথাই বলতে চাই—কর্মস্থল বদলে যায়, পদবি বদলে যায়, দায়িত্ব বদলে যায়; কিন্তু মানুষের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও হৃদয়ের টান কখনো বদলায় না। বাঁশখালী আমার কর্মস্থল ছিল, কিন্তু আজীবন এটি আমার হৃদয়ের একটি প্রিয় ঠিকানা হয়ে থাকবে।
বিদায় নয়—আবার কোনো না কোনোভাবে, কোনো না কোনো প্রেক্ষাপটে দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ।
সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।
আল্লাহ হাফেজ।
মোঃ ওমর সানী আকন
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (বিদায়ী)
বাঁশখালী, চট্টগ্রাম