সাইনবোর্ডে সরকারি দপ্তর হলেও ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা ভূমি অফিসের ভেতরের সমীকরণটা একটু ভিন্ন। দাপ্তরিক পদে তিনি নিছকই এক অফিস সহায়ক—১৮তম গ্রেডের কর্মচারী। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামোর সমীকরণে তিনিই দপ্তরের অঘোষিত ‘হর্তাকর্তা’। নাম মো. আজাদ। ২০০১ সালে ২০তম গ্রেডে যোগ দেওয়ার পর টানা চব্বিশ বছর ধরে একই দপ্তরে বহাল তবিয়তে আছেন তিনি। দীর্ঘ এই সময়ে জাঁকিয়ে বসে গড়ে তুলেছেন এক দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট, যার মূল কাজই হলো সরকারি নথি ও তথ্য প্রদানের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।
অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে সরকারি নথি নিয়ন্ত্রণে আজাদের অনুসৃত অভিনব কৌশল। নিয়ম অনুযায়ী, জমি বন্দোবস্ত, স্পর্শকাতর মিস কেস, নামজারি বা খতিয়ানের মতো সংবেদনশীল ফাইলের আলমারি তালাবদ্ধ অবস্থায় সহকারী কমিশনারের (ভূমি) প্রশাসনিক হেফাজতে থাকার কথা। কিন্তু অফিশিয়াল কাজ কিংবা কোনো সেবাপ্রার্থীর ফাইল খোঁজার অজুহাতে এসিল্যান্ডের কাছ থেকে চাবি চেয়ে নেওয়াই আজাদের প্রথম চাল। চাবি একবার তাঁর হাতে এলে তা আর সহজে কর্মকর্তার টেবিলে ফেরত যায় না। আলমারি খুলে তথ্য বিক্রি ও সরকারি নথি কেনাবেচার আড়ত বসান আজাদ।
দাপ্তরিক নথিতে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কোনো সরাসরি প্রমাণ না মিললেও, চাবি হস্তান্তরের পর সারাদিন তা একজন নিম্নস্তরের কর্মচারীর পকেটে থাকা এবং প্রশাসনিক এ নৈরাজ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনিক এই চরম ঢিলেঢালা ভাব ও তদারকির অভাবকে পুঁজি করেই নিজেকে দপ্তরের ‘সর্বেসর্বা’ বানিয়ে ফেলেছেন আজাদ।
ভুক্তভোগীদের বিবরণ অনুযায়ী, চাবি আজাদের পকেটে যাওয়ার পর প্রতিটি ফাইলের ধরণ অনুযায়ী শুরু হয় দর-কষাকষি। চাহিদামতো অর্থ না দিলে নির্ভেজাল ফাইলও থমকে থাকে মাসের পর মাস; আর পকেট গরম করলেই মুহূর্তে সচল হয় কাজ।
দক্ষিণ আইচা এলাকার বাসিন্দা বাদশা তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘২০১২-১৩ সালে সরকার দক্ষিণ চর আইচা মৌজায় আমাকে জমি বন্দোবস্ত দেয়। নথিপত্রে নাম আছে কি না জানতে আজাদের কাছে গেলে তিনি শুধু ফাইল দেখানোর জন্যই সাড়ে তিন হাজার টাকা চান। বাধ্য হয়ে টাকা দেওয়ার পর তিনি গোপন ফাইল বের করে আমাকে ফটোকপি সরবরাহ করেন।’
আজাদের নৈরাজ্যের একই চিত্র তুলে ধরেন রসুলপুর ইউনিয়নের এক সেবাপ্রার্থী। নাম গোপন রাখার শর্তে তিনি বলেন, ‘আজাদের কাছে সাধারণ মানুষ পুরোপুরি জিম্মি। তার হাতে টাকা গুঁজে দিলে ১৫ দিনের কাজ এক দিনেই হয়ে যায়। একটি মিস কেসের ফাইল সচল করতে তিনি আমার কাছ থেকে চার হাজার টাকা নিয়েছেন।’
উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আজাদের চাকরি জীবন শুরু ২০০১ সালে—২০তম গ্রেডে। এরপর টানা চব্বিশ বছর ধরে তিনি চরফ্যাশন উপজেলা ভূমি অফিসেই অবস্থান করছেন। বর্তমানে ১৮তম গ্রেডে বেতন পাওয়া আজাদের দাপটে অন্য কর্মচারীরাও থাকেন কোণঠাসা।
একই কার্যালয়ে দীর্ঘ অবস্থানের কারণে কোন ফাইলের দুর্বলতা কোথায়, তা আজাদের নখদর্পণে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফাইলের গুরুত্ব বুঝে কেসপ্রতি ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয় এই সিন্ডিকেট।
কেবল নথি বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয় আজাদের প্রতাপ। ভূমি অফিস চত্বরে থাকা দুটি সরকারি পুকুর নিজের দখলে রেখে মাছ চাষ করছেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে একটি সরকারি বাসভবনও অবৈধভাবে দখলে রেখেছেন। এমনকি অবৈধ উপার্জনের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে কার্যালয়ে অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে অফিস সহায়ক মো. আজাদ বলেন, ‘আমি যে বাসায় থাকি সেটি সরকারি হলেও পরিত্যক্ত। অফিসের কোনো নথিপত্র আদান-প্রদানের সাথে আমি জড়িত নই। কারো কাছ থেকে টাকা নেওয়ার প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। পুকুরও আমার দখলে ছিল না।’
একই দপ্তরে বছরের পর বছর অবস্থান করে কৌশল খাটিয়ে নথি বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ভোলা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অনিন্দ্য মন্ডল বলেন, ‘একই দপ্তরে এতদিন ধরে কোনো কর্মচারীর অবস্থান করার সুযোগ নেই। চাবি পকেটে রাখা কিংবা নথি বাণিজ্যের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’