সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সংলগ্ন গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ এলাকার বেলতলা নামক স্থানে কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন, ড্রাগ লাইসেন্স ও মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই গড়ে উঠেছে ব্লোমিং ফার্মা লিঃ নামক একটি অবৈধ ভেজাল পশু ওষুধ তৈরির কারখানা। সম্প্রতি ওই কারখানায় পেশাগত দায়িত্ব পালন ও তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন সংবাদকর্মীরা।
দেশের ক্রমবর্ধমান প্রাণিসম্পদ খাতে গবাদিপশুর চিকিৎসাকে পুঁজি করে একটি অসাধু চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে ভেটেরিনারি ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছে। মফস্বল ও গ্রামগঞ্জের সাধারণ খামারিদের সরলতার সুযোগ নিয়ে কম দামে এসব মানহীন ওষুধ স্থানীয় বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে একদিকে যেমন খামারিরা আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে ভেজাল ওষুধের অবশিষ্টাংশ খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব কারখানায় ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ রাসায়নিক, টেকনিক্যাল গ্রেড কেমিক্যাল এবং ভেজাল লালিগুড় ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, ক্যালসিয়াম এবং অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প নিম্নমানের পাউডার ও সিরাপ তৈরি করা হয়। কোনো রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্টের তদারকি কিংবা ল্যাব টেস্ট ছাড়াই অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে এসব পণ্য উৎপাদন করা হয়। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাতের আঁধারে কেমিক্যাল মিশিয়ে এসব ওষুধ বোতলজাত করা হয় এবং পরে আকর্ষণীয় প্রিন্টেড স্টিকার লাগিয়ে তা বিভিন্ন এলাকার খুচরা বাজারে সরবরাহ করা হয়।
গত ৫ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চারজন সংবাদকর্মী—জাহিদুর রহমান জাহিদ, মো. ফজলুল হক, মোজাফ্ফর হোসেন এবং তাঁদের এক সহকর্মী—উক্ত কারখানায় তথ্য সংগ্রহ ও সত্যতা যাচাইয়ের জন্য যান। এ সময় কারখানার কর্মী রাকিবুর রহমানসহ ১০ থেকে ১২ জনের একটি চক্র সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা সংবাদকর্মীদের ‘ভুয়া সাংবাদিক’ আখ্যা দিয়ে দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে অতর্কিত হামলা চালায়। এই হামলায় পাঁচজন সংবাদকর্মী আহত হন।
পরবর্তীতে সাংবাদিকরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে নিজেদের রক্ষা করেন এবং তৎক্ষণাৎ জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করে পুলিশের সহায়তা চান। খবর পেয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধ পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে কারখানাটিতে কোনো বৈধ নথিপত্র বা অনুমোদন না পেয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের পরামর্শ দেন। ঘটনার পরপরই বিষয়টি সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অবহিত করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এবং রাজনৈতিক প্রভাবে বিগত বিভিন্ন সময় থেকেই এই অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে এবং বর্তমানেও তাদের সেই দৌরাত্ম্য অব্যাহত রয়েছে।
অনুমোদনহীন ও মানহীন এসব ওষুধ ব্যবহার করে গবাদিপশু সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে উল্টো জটিল ও মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। এক ভুক্তভোগী ডেইরি খামারি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত মাসে তাঁর গবাদিপশু অসুস্থ হলে স্থানীয় বাজার থেকে এই প্রতিষ্ঠানের ওষুধ কিনে খাওয়ানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর তিনটি গরু মারা যায়। পরবর্তীতে ভেটেরিনারি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে তিনি জানতে পারেন যে ওষুধগুলো সম্পূর্ণ ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকে ভরপুর ছিল।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গবাদিপশুর মৃত্যু বা খামারিদের আর্থিক ক্ষতিই নয়; বরং ভেজাল ওষুধের ক্ষতিকর রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ দুধ ও মাংসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এর ফলে মানবদেহে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো ভয়ংকর ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন ভেজাল পশু ওষুধ প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি রয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বা এ ধরনের অননুমোদিত কারখানার সন্ধান পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভেটেরিনারি ড্রাগের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে মনিটরিং আরও জোরদার করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভেজাল ও মানহীন ওষুধের এই দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করতে হলে নিয়মিত সাঁড়াশি অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিকল্প নেই। পাশাপাশি খামারিদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা কোনো প্রেসক্রিপশন বা বৈধ সিলমোহর ছাড়া অজানা ও অননুমোদিত কোম্পানির ওষুধ ব্যবহার থেকে বিরত থাকেন।