বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানের সমাপনী দিন গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) শেষ হয়েছে।
সমাপনী দিনের কর্মসূচি হিসাবে সকাল ১০ টায়, রবীন্দ্র মেলার মাধ্যমে শুরু হয়। পরবর্তীতে দুপুর ২ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে “নজরুলের দেশপ্রেম ও বিশ্বমানব-দর্শন : আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট” শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
এতে প্রবন্ধ পাঠ করেন, বাংলা বিভাগের প্রভাষক, মোঃরাকিবুল হাছান। সেমিনারে মূল আলোচক হিসেবে আলোচনা করেন, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক ও বিশিষ্ট নজরুল গবেষক, কবি আবদুল হাই শিকদার।
এসময় স্বাগত বক্তব্য রাখেন,রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. সুমন কান্তি বড়ুয়া। সভাপতিত্ব করেন, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার।
সেমিনারের আলোচনায় বক্তরা নজরুলের দেশপ্রেম, সাম্যবাদী চেতনা, মানবতাবাদ এবং বিশ্বজনীন দর্শনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
পরে বিকাল ৪ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতারের সভাপতিত্বে পুরস্কার বিতরণ ও সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চ্যুয়ালি সংযুক্ত ছিলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, ড. এম এ মুহিত। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন,বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সকলকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।
দাপ্তরিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে অত্যন্ত ব্যস্ততার জন্য স্বশরীরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকতে পারলেও ভবিষ্যতে স্বশরীরে উপস্থিত থাকার আশা ব্যক্ত করেন মাননীয় প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ এবং অন্যান্য সামগ্রিক উন্নয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রচেষ্টায় এই বিশ্ববিদ্যালয় সার্বিক বিকাশ লাভ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। তিনি দৃঢ়তার সাথে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীর মত এমন আরও আয়োজনের মাধ্যমে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা রবীন্দ্র-নজরুল চর্চাসহ বাংলা সংস্কৃতি চর্চায় ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবে। পরিশেষে তিনি রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানের সার্বিক সফলতা কামনা করেন এবং আয়োজন সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
এরপর বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক,কবি আবদুল হাই শিকদার। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, নজরুলের সাহিত্যকর্মে সাম্য, মানবমুক্তি ও শোষণবিরোধী চেতনা এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর কবিতায় ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণিভেদ অতিক্রম করে সর্বজনীন মানবসমতার আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, নজরুল আমাদের জাতীয় জীবনে অন্যায়, অত্যাচার ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে অদম্য প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নজরুলের বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি সামাজিক, ধর্মীয় ও মানসিক শৃঙ্খলমুক্তিরও ঘোষণা।
জাতীয় কবি ও বিশ্বকবির সাহিত্যের তুলনামূলক আলোচনায় তিনি বলেন, উভয়েই বাংলা সাহিত্যের অমর স্রষ্টা, তবে তাঁদের সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে মানবতাবাদ, প্রকৃতিপ্রেম ও আধ্যাত্মিকতার গভীর প্রকাশ দেখা যায়, আর নজরুলের সাহিত্যে বিদ্রোহ, সাম্য ও সংগ্রামের সুর অধিক প্রবল। রবীন্দ্রসাহিত্য অধিকতর শান্ত, সুষম ও দার্শনিক; নজরুল সাহিত্য অধিকতর তেজস্বী, গতিশীল ও প্রতিবাদমুখর।
সভাপতির বক্তব্যে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার বলেন, আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি মাননীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত মহোদয়ের প্রতি। ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও তিনি আমাদের অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে মূল্যবান বক্তব্য প্রদান করেছেন। তাঁর উপস্থিতি আমাদের উৎসাহিত করেছে এবং এই আয়োজনের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে।
আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই বিশিষ্ট নজরুল গবেষক, কবি ও দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক,কবি আবদুল হাই শিকদার মহোদয়কে। তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ আলোচনা আমাদের নজরুলচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। উপাচার্য আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল কেবল বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র নন; তাঁরা আমাদের মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য, স্বাধীনচেতা মনন এবং বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির চিরন্তন পথপ্রদর্শক। তাঁদের সৃষ্টিকর্ম ও জীবনদর্শন আজও আমাদের চিন্তা, চেতনা ও মূল্যবোধ নির্মাণে অনুপ্রেরণা জোগায়। আমি বিশ্বাস করি, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ এবং নজরুলের সাম্য ও মুক্তির চেতনা ধারণ করে আমাদের শিক্ষার্থীরা একটি জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। উপাচার্য দুই দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা করার জন্য রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন আপনাদের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা এই আয়োজনকে প্রাণবন্ত ও স্মরণীয় করে তুলেছে। আপনাদের শিল্পসাধনা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গীকার আমাদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
পরিশেষে উপাচার্য এই সফল আয়োজন বাস্তবায়নের পেছনে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ—তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আপনাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এ ধরনের একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। সকলের সুস্বাস্থ্য, সাফল্য ও মঙ্গল কামনা করে দুই দিনব্যাপী রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানের সমাপনী ঘোষণা করেন।
অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র সংগীত প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পরে বিকেল ৫ টায় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে রবীন্দ্র-নজরুলের সৃষ্টিশীল চেতনা এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়।
উল্লেখ্য, দুইদিনব্যাপী আয়োজনের মধ্যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, রবীন্দ্র মেলা, রবীন্দ্র সংগীত প্রতিযোগিতা, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল বিষয়ক সেমিনার, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত ছিল। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সংস্কৃতিকর্মী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়।