পৃথিবীতে কত শত সম্পর্ক আছে, কিন্তু ‘বাবা’ নামের বটবৃক্ষের মতো আগলে রাখার মতো কেউ নেই। আজ বিশ্ব বাবা দিবস। কেউ হয়তো বাবার হাত ধরে আনন্দ ভাগাভাগি করছে, আর কেউ বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে খুঁজছে তার হারিয়ে যাওয়া সবচেয়ে বড় শক্তিকে।
আমি যখন খুব ছোট, সবেমাত্র দুনিয়াটাকে চিনতে শুরু করেছি-ঠিক তখনই আমার মাথার ওপর থেকে সরে গিয়েছিল বাবার স্নেহের ছায়া। কিন্তু ওই অল্প বয়সে বাবার দেওয়া আদর, যত্ন আর নিখাদ ভালোবাসার স্মৃতি আজ ৪১ বছর বয়সে এসেও আমার অন্তরের গভীরে ঠিক একইভাবে জীবন্ত হয়ে আছে। মাঝে মাঝে ভাবি, বাবা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে হয়তো আমার জীবনের ভাগ্যটা আরও অন্যরকম হতে পারতো, আরও অনেক উন্নতি হতে পারতো।
ছোট থাকার কারণে নিয়তির নির্মম পরিহাস দেখতে হয়েছে আমাকে। বাবার রেখে যাওয়া ব্যবসা-বাণিজ্য, জায়গা-সম্পত্তি-সবকিছু চক্রান্ত করে দখল করে নিয়েছিল আপন নামের সেইসব আত্মীয়-স্বজনেরা। এই স্বার্থপর পৃথিবীতে ভালো মানুষ বলতে আজ সত্যিই কিছু নেই। সবাই যেন এক একটা মুখোশধারী শয়তান! যারা বাবার মৃত্যুর পর একটা অবুঝ শিশুর অধিকার কেড়ে নেয়, আমি আজ একজন গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে দাঁড়িয়েও বলছি-জীবনে কোনোদিন, কোনো অবস্থাতেই তাদের আমি ক্ষমা করব না। বাবা যখন মারাত্মক অসুস্থ, তখন পুরো পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র আমি আর আমার মা-ই ছিলাম তাঁর পাশে। মৃত্যুর আগের সেই শেষ রাতটি…।
আজ এত বছর পরেও বারবার আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমার বাবা গরু আর মুরগির কলিজা ও ঘিলা খেতে খুব পছন্দ করতেন। সেদিন মা বাজার থেকে বাবার সেই প্রিয় খাবারগুলো বাজার থেকে রান্না করার জন্য কিনে এনেছিলেন, এবং খুব সুন্দর করে রান্না করেছিলেন, কিন্তু… দীর্ঘশ্বাস) নিয়তির কী নিষ্ঠুর খেলা! বাবা সেই খাবার আর মুখে তুলে নিতে পারেননি। খাবার টেবিলেই রয়ে গেল, আর আমার বাবা এই পৃথিবীর সব মায়া ত্যাগ করে পরকালের চিরন্তন যাত্রায় পাড়ি জমালেন।
মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে অজান্তেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। পরম শান্তিতে বাবার বুকে মাথা রেখেছিলাম। কিন্তু যখন আমার ঘুম ভাঙলো… তাকিয়ে দেখি আমার বাবা আর নেই। চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে তার চেনা বুকটা। বাবার শেষ বিদায়ের দিন গোসল করানো থেকে শুরু করে দাফনের যাবতীয় কাজ নিজ হাতে করেছিলাম। কিন্তু সেদিন আমার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানিও বের হয়নি। কান্নায় ভেঙে পড়িনি আমি। তখন চারপাশের অনেক মানুষকে বলতে শুনেছিলাম, “ছেলেটা কত বড় পাষাণ! কত স্বার্থপর, বাবার মৃত্যুতেও কাঁদে না! আজ যখন আমি নিজে বড় হয়েছি, নিজে একজন সন্তানের বাবা হয়েছি, আজ আমি বুঝতে পারছি সেদিন কেন আমার চোখে পানি আসেনি। আসলে তীব্র শোকে পাথর হয়ে যাওয়া ওই অবুঝ মনটার কান্না সেদিন চোখে নয়, কলিজার ভেতর রক্তক্ষরণ হয়ে ঝরেছিল। বাবা হওয়ার পর আজ প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করি-বাবা কী জিনিস! বাবার সম্পর্কে লিখতে বসলে হয়তো জীবন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু লেখা শেষ হবে না। ওপারে অনেক ভালো থেকো বাবা। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে আজকের দিনে একটাই আকুল প্রার্থনা-তিনি যেন আমার বাবা সহ পৃথিবীর সকল প্রয়াত বাবাদের জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। আমিন, সুম্মা আমিন।