বর্ষা আসার সাথে সাথে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন নদীতে পানি বাড়তে শুরু করেছে। নদীতে পানি প্রবাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ ফিরে পেয়েছে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার প্রায় দুইশত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট। স্থানীয়দের থেকে জানা যায়, সাপ্তাহের প্রতি বুধবার ঘিওর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে বসে এই হাট।
মানিকগঞ্জ জেলার দূর-দূরান্তের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে নৌকা নিয়ে আসেন ব্যবসায়ী ও কারিগররা। সারি সারি সাজানো ছোট-বড় ডিঙ্গি নৌকার বাহারি রূপ ও ক্রেতা-বিক্রেতার আলাপচারিতায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো হাট। হাটের দিনে ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় জমে ওঠে হাটের চারিপাশ। স্থানীয় পর্যায়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতের ব্যাপক ভূমিকা রাখছে ঐতিহ্যের ধারক এই গ্রামীন নৌকার হাট।
বুধবার সকালে হাট ঘুরে দেখা যায়, বর্ষার মৌসুমকে ঘিরে নৌকার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কেনাবেচাও বেশ জমজমাট। তবে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে গত বছরের তুলনায় নৌকার দামও বেড়েছে বলে জানান ক্রেতা ও বিক্রেতারা।
জাফরগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম টানা ৪৬ বছর ধরে নৌকার ব্যবসা করছেন। এবারও তিনি চাম্বল কাঠের নৌকা নিয়ে এসেছেন বিক্রির জন্য। তিনি বলেন, “গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার নৌকার দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে। বিক্রিও মোটামুটি সন্তোষজনক।”
আব্দুল করিমের মতো আরও অনেক ব্যবসায়ী দূর-দূরান্ত থেকে নৌকা নিয়ে এসেছেন এই ঐতিহ্যবাহী হাটে। সকাল থেকেই তারা সারি সারি নৌকা সাজিয়ে ক্রেতাদের অপেক্ষায় বসে থাকেন।
হাটে ২৬টি ছোট-বড় নৌকা নিয়ে আসা ব্যবসায়ী কমল বেপারী বলেন, “কাঠ, লোহাসহ নৌকা তৈরির সব ধরনের উপকরণের দাম বেড়েছে। দক্ষ কারিগরের মজুরিও অনেক বেশি। তাই আগের তুলনায় নৌকার দাম কিছুটা বাড়াতে হয়েছে।”
অন্যদিকে ক্রেতারা বলছেন, দাম বৃদ্ধির কারণে নৌকা কিনতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। নৌকা কিনতে আসা সিরাজ মিয়া বলেন, “আমার বাড়ির চারপাশে পানি, তাই নৌকা কিনতেই হবে। কিন্তু এসে দেখি গত বছর যে নৌকা পাঁচ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এবার সেই নৌকার দাম আট হাজার টাকারও বেশি চাওয়া হচ্ছে।”
হাট ঘুরে দেখা যায়, আকার ও মানভেদে প্রতিটি ডিঙ্গি নৌকা ৩ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এখানে স্টিলের নৌকার পাশাপাশি চাম্বল, কড়ই, মেহগনি, আম, কদম, জামরুল, ঝিকা, ডোমরা ও শিমুল কাঠের তৈরি নৌকাও পাওয়া যায়। ব্যবসায়ীদের মতে, পানিতে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় চাম্বল ও কড়ই কাঠের নৌকার চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
ঐতিহ্যবাহী এই হাটে গরু-ছাগলের হাটের মতো নৌকার ওপরও হাসুলী আদায় করা হয়। প্রতি হাজার টাকার বিক্রিতে ৬০ টাকা হারে হাসুলী নেওয়া হয়। এবার হাটের ইজারা পেয়েছেন ঘিওর কলেজ ছাত্রদলের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ ও তার পরিবারের সদস্যরা।
ইজারাদার খালেদ বলেন, “আগে এই হাটে এত নৌকা আসত যে ঈদগাহ মাঠ ছাড়িয়ে পাশের কলেজ মাঠ পর্যন্ত ভরে যেত। এখন নৌকার সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বেচাকেনা ভালো হচ্ছে। জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত এই হাটে নিয়মিত বেচাকেনা চলবে। বর্ষা যত গভীর হবে, নৌকার চাহিদাও তত বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।”
ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাশিতা-তুল ইসলাম বলেন, “প্রায় দুইশো বছরের ঐতিহ্য বহন করা ঘিওরের এই নৌকার হাট এখনো বর্ষাকেন্দ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতি হাটেই রংবেরঙের নৌকা উঠে দেখতেও ভালো লাগে। এই হাটটা নিয়ে ভবিষ্যতে ভালো কোন কাজ করা যায় কিনা আমরা পরিকল্পনা করছি।
সময়ের পরিবর্তনে নৌকার ব্যবহার কিছুটা কমলেও বর্ষা এলেই ঘিওরের এই ঐতিহ্যবাহী হাট আবারও প্রমাণ করে, বাংলার নদীভিত্তিক জীবনযাত্রা ও গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক আজও অটুট। দুই শতকের ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে প্রতি বর্ষায় এই হাট শুধু নৌকা কেনাবেচার কেন্দ্রই নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে