শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নে অবস্থিত প্যারাগন ফিড লিমিটেড এগ্রো কমপ্লেক্সের তীব্র দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত বর্জ্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের জনজীবন। কারখানা থেকে নির্গত দূষিত পানি ও মুরগির বর্জ্যে নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি, খাল-বিল, মাছ ও পরিবেশ। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন শতশত কৃষক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে উপজেলার মধ্যমকুড়া গ্রামে প্রায় ২৮ একর জমির ওপর নির্মিত হয় প্যারাগন ফিড লিমিটেড এগ্রো কমপ্লেক্স। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২১ লাখ মুরগি পালন করা হয় এবং দৈনিক প্রায় ১৩ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি মুরগির বিষ্ঠা থেকে কম্পোস্ট সার উৎপাদন করা হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক কোনো শোধনাগার বা কার্যকর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও কালো পানি আশপাশের কৃষিজমি, বিল ও জলাশয়ে ফেলার কারণে ফসলি জমিতে পচন ধরছে এবং ধানসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক জমিতে এখন আর কোনো ধরনের আবাদ সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে দূষিত পানিতে মাছ মারা যাচ্ছে এবং গৃহপালিত হাঁস-মুরগিও আক্রান্ত হচ্ছে।
উৎকট দুর্গন্ধ ও মশা-মাছির উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সুতানাল, বিন্নিবাড়ি, শিংমাড়ি, কাকরকান্দি, সুতিয়ারপাড়, শালমারা ও সোহাগপুরসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরাও দুর্ভোগে পড়েছে। ঘাইলারা শামছুল হক উচ্চ বিদ্যালয়, শালমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিন্নিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাকরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বরুয়াজানি হাসান উচ্চ বিদ্যালয় ও মুক্তিযোদ্ধা কলেজের শিক্ষার্থীরা দুর্গন্ধের কারণে স্বাভাবিকভাবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কারখানার পাশের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে পচন ধরেছে। বিষাক্ত কালো পানিতে শতশত একর জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক বাড়িতে দিনের বেলাতেও মশারি টানিয়ে খাবার খেতে হচ্ছে। মুরগির পালক উড়ে এসে খাবারে পড়ছে বলেও অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় বাসিন্দা শহর আলী বলেন, “এই দুর্গন্ধে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন কেউ আমাদের এলাকায় বিয়ে-শাদির সম্পর্ক করতেও চায় না।”
পলাশিয়া গ্রামের কৃষক আতাব উদ্দীন বলেন, “কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে আমাদের শতশত একর জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিলেও এখন কর্তৃপক্ষের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে।”
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নিয়ামুল কাউসার জানান, কারখানার দূষিত পানির কারণে কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে শেরপুর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, প্যারাগন কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কম্পোস্ট প্ল্যান্ট নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুত কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।