দেশে হামের (মিজেলস) সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জেলা ও রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থা ও টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জাতীয় পার্টির কো-চেয়ার, বিশিষ্ট সমাজ সেবক সাহিদুর রহমান টেপা তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে হামের টিকার সংকট, গাফিলতি ও আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে এক ভিডিও বার্তায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “গত আট বছর দেশ শাসন করেছে শেখ হাসিনার সরকার ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস। তারা গত আট বছর দেশের শিশুদেরকে হামের টিকা দেয়নি। এটা নিঃসন্দেহে একটি পরিকল্পিত অপরাধ। যারা শাসন ক্ষমতায় ছিলো তারা অর্থ পাচার, গুম-খুন, হত্যা, লুটতরাজ, মব সন্ত্রাস করেছে, দেশকে একশ বছর পিছিয়ে দিয়েছে-অথচ শিশুদেরকে হামের টিকা দেয়নি। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিৎ।”
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও পল্লীবন্ধু হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের আদর্শের সৈনিক হিসেবে সাহিদুর রহমান টেপা দেশের সকল নাগরিকের প্রতি উদাত্ব আহবান জানিয়ে বলেন, “দেশের প্রতিটির মানুষের উচিত দলমত নির্বিশেষে আপামর জনসাধারণ, কৃষক-শ্রমিক, বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিকসহ সকল পেশাজীবি নিজ নিজ অবস্থান হতে অর্থ, শ্রম দিয়ে হামের টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে সরকারকে সাথে নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমাদের শিশুদের জীবন রক্ষার দায়িত্ব আমার-আপনার, সকলের।”
গত আট বছরে দেশের শিশুদের নিয়মিতভাবে হামের টিকা দেওয়া হয়নি, যা একটি গুরুতর ব্যর্থতা। তার ভাষায়, “দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলোর এই অবহেলা শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে এবং এর জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।”
উল্লেখ্য গত ২৯ মার্চ (রোববার) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক ওষুধ শিল্প মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় কালে নবগঠিত সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানান, “গত ৮ বছর এদেশে হামের কোনো টিকা দেওয়া হয়নি। দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার এবং দ্রুত টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।“
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ নিয়মে শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার কথা। পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদেরও টিকাদান করা হয়ে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কর্মসূচিতে ঘাটতি থাকায় রোগটির পুনরুত্থান ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছরের শুরু থেকে অন্তত ১২টি জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক ডজন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং হাজার হাজার শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকা এবং কক্সবাজার-এর রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে সংক্রমণের হার বেশি দেখা গেছে।
রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। অধিকাংশ রোগীই শিশু, যাদের মধ্যে অনেকে গুরুতর অবস্থায় ভর্তি রয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ভেন্টিলেটর সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি পুনরায় চালু না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তারা অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার ওপর জোর দিচ্ছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় জনস্বাস্থ্য রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।