দেশবরেণ্য রাজনীতিক, প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাবেক মন্ত্রী এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি—এনডিপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জননেতা আনোয়ার জাহিদের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আগামী বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট)। ২০০৮ সালের এই দিনে ঢাকার গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতা জীবনের অধিকারী আনোয়ার জাহিদ ছিলেন এমন একজন জাতীয় নেতা, যাঁর জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংবাদিকতা, জাতীয় ঐক্য এবং জনকল্যাণের নানা অধ্যায় গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে আগামী ১৩ আগস্ট সকাল ১১টায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। একই স্থানে জননেতা আনোয়ার জাহিদ স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
এছাড়া তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি—এনডিপির উদ্যোগেও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আনোয়ার জাহিদের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণ ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।এনডিপির চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্তজা ও মহাসচিব মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা এক বিবৃতিতে দলীয় নেতাকর্মী ও দেশবাসীর প্রতি যথাযথ মর্যাদা, শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে জননেতা আনোয়ার জাহিদের মৃত্যুবার্ষিকী পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।
ভাষা আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক সংগ্রামে আনোয়ার জাহিদের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১২ জুন ঝিনাইদহের দাড়িয়া গোবিন্দপুর গ্রামে। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর মধ্যে দেশ, মানুষ ও সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা তৈরি হয়।
তিনি ঝিনাইদহ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়, দৌলতপুর বিএল কলেজ ও রাজশাহী সরকারি কলেজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ শ্রেণিতে ভর্তি হন। তবে রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং কারাবরণের কারণে তাঁর এমএ পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছাত্রজীবনেই তিনি ঝিনাইদহে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন, পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি—ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় থাকেন।তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—জনগণের অধিকার, জাতীয় স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আনোয়ার জাহিদ জাতীয় রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি সরকারের তথ্যমন্ত্রী ও ত্রাণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি গণমাধ্যম, জনকল্যাণ ও সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
পরবর্তীতে প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি—এনডিপি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র ও জনগণের অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।পরবর্তীকালে তিনি বিএনডিপি প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন উদ্যোগে ভূমিকা রাখেন।
সাংবাদিক আনোয়ার জাহিদ: কলম ছিল তাঁর শক্তি রাজনীতির পাশাপাশি সাংবাদিকতায়ও আনোয়ার জাহিদের অবদান ছিল অসাধারণ।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে দৈনিক ইত্তেহাদ-এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা করেন তিনি। সেই সময় থেকেই তাঁর লেখনীতে জাতীয় রাজনীতি, মানুষের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় নীতির নানা দিক উঠে আসত।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি ধূমকেতু, সংবাদ, ইত্তেফাক, জনতা, গণবাংলা, দ্য পিপলস, বাংলাদেশ টাইমস ও দৈনিক ইনকিলাবসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা ও সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালন করেন।
একজন সাংবাদিক হিসেবে তিনি শুধু সংবাদ পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসঙ্গতি নিয়ে মতামত প্রকাশ করেছেন। তাঁর লেখনী ছিল যুক্তিনির্ভর, সাহসী এবং সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। একই ব্যক্তির মধ্যে সাংবাদিকতা ও রাজনীতির এমন সমন্বয় তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দেয়।
আনোয়ার জাহিদের রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জাতীয় ঐক্য। বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন মত ও পথের মানুষের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি বারবার তুলে ধরেছেন। এনডিপির চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্তজা আনোয়ার জাহিদের আলোচিত ‘থ্রি ইউনিটি’ তত্ত্বকে জাতীয় ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চিন্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এই চিন্তার মূলকথা ছিল—জাতীয় স্বার্থে বিভাজন অতিক্রম করে বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। বর্তমান সময়েও যখন রাজনৈতিক বিভাজন, মতপার্থক্য ও সামাজিক দূরত্ব নিয়ে নানা আলোচনা চলছে, তখন আনোয়ার জাহিদের জাতীয় ঐক্যের ভাবনা নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।
আপসহীন জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনোয়ার জাহিদ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, “স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থে তিনি কখনো আপস করেননি।”
সাবেক মন্ত্রী জামাল হায়দার তাঁকে অভিহিত করেছেন একজন “সব্যসাচী রাজনীতিবিদ” হিসেবে।
এই মূল্যায়নগুলো থেকেই বোঝা যায়, আনোয়ার জাহিদের রাজনৈতিক পরিচয় কেবল একটি দলের নেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি জাতীয় রাজনীতির বৃহত্তর পরিসরে নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
মানুষ আনোয়ার জাহিদ একজন রাজনীতিক ও সাংবাদিক হিসেবে আনোয়ার জাহিদের পরিচিতির পাশাপাশি তাঁর আরেকটি বড় পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন মানুষের নেতা।
রাজনীতির মাঠে সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্ব দিতেন বলে তাঁর সহকর্মীরা স্মরণ করেন। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম নয়; বরং মানুষের কথা বলার, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এবং রাষ্ট্রকে জনকল্যাণমুখী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতা জীবনের অবসান ঘটে ২০০৮ সালের ১৩ আগস্ট। ঢাকার গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
মৃত্যুকালে তিনি এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রেখে যান। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় একটি বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তাঁর সহকর্মী, রাজনৈতিক অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মতে, আনোয়ার জাহিদের মতো একই সঙ্গে রাজনীতিক, সাংবাদিক, সংগঠক ও জাতীয় ঐক্যের প্রবক্তা হিসেবে ভূমিকা রাখা ব্যক্তিত্ব আজকের রাজনীতিতে বিরল।
তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, দীর্ঘ ১৮ বছর পরও সেই শূন্যতা পূরণ হয়নি—এমনটাই মনে করেন তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী ও অনুসারীরা।
নতুন প্রজন্মের কাছে আনোয়ার জাহিদ
আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে আনোয়ার জাহিদের জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার পাঠ।ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা, দীর্ঘ কারাবরণ, সাংবাদিকতা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন, নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ঐক্যের জন্য কাজ—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—রাজনীতি ও সাংবাদিকতা দুটিই মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। নীতি ও আদর্শকে সামনে রেখে জনসম্পৃক্ত রাজনীতি করা সম্ভব এবং মতপার্থক্যের মধ্যেও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়।
তাঁর আদর্শকে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার আনোয়ার জাহিদের মৃত্যুবার্ষিকী পালনের মূল উদ্দেশ্য শুধু তাঁকে স্মরণ করা নয়; বরং তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।
এনডিপি মনে করে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানুষের অধিকার এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এসব ক্ষেত্রে আনোয়ার জাহিদের চিন্তা ও কর্মজীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জননেতা আনোয়ার জাহিদকে। তিনি ছিলেন রাজনীতির মাঠে একজন সংগ্রামী নেতা, সাংবাদিকতার জগতে একজন সাহসী কলমযোদ্ধা এবং জাতীয় জীবনে একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। তাঁর কর্ম ও আদর্শ আমাদের রাজনৈতিক পথচলায় প্রেরণা হয়ে থাকুক—এটাই আজকের দিনে আমাদের প্রত্যাশা।
আল্লাহ জননেতা আনোয়ার জাহিদকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।