মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব ধীরে ধীরে দেশের জ্বালানি বাজারেও প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্ন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় রাজশাহী নগরীতে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা। ফলে নগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক ভিড় ও দীর্ঘ সারি।
গতকাল শুক্রবার (০৬ মার্চ) সকালে নগরীর একাধিক পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সীমিত পরিমাণ জ্বালানি পাচ্ছেন। বেশিরভাগ পাম্পেই একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকার বেশি পেট্রোল বা অকটেন দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
হঠাৎ করে জ্বালানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে এই সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে বলে পাম্প মালিকরা দাবি করলেও এতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, বাজারে তেলের সংকট না থাকলেও যুদ্ধের আতঙ্কে মানুষ আগেভাগেই জ্বালানি মজুত করতে শুরু করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
নগরীর লতা ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক রবিউল ইসলাম খোকন বলেন, তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরের পথে যাত্রা করবেন। কিন্তু পাম্প কর্তৃপক্ষ তাকে মাত্র ৩০০ টাকার তেল দিয়েছে। তার ভাষায়, “তেলের প্রকৃত সংকট নেই। কিন্তু যুদ্ধের খবর শুনে মানুষ হুড়োহুড়ি করে তেল কিনছে। এতে যারা জরুরি কাজে দূরে যেতে চাইছেন, তাদের জন্য সমস্যা তৈরি হচ্ছে।”
একই অভিযোগ করেন কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানা। তিনি বলেন, “সকাল থেকে প্রায় আধা ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এতক্ষণ অপেক্ষার পরও ৩০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না। দূরের পথে যেতে হলে এই পরিমাণ তেল একেবারেই অপ্রতুল।”
প্রাইভেটকার চালক মাহমুদ হাসানও একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান। তিনি বলেন, “পরিবার নিয়ে বাইরে কোথাও গেলে গাড়িতে একটু বেশি তেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু ৩০০ টাকার তেলে খুব বেশি দূর যাওয়া যায় না। যদি আসলে কোনো সংকট না থাকে, তাহলে কেন এই সীমাবদ্ধতা—সেটা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।”
অন্যদিকে মোটরসাইকেল চালক কামাল হোসেন জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল চালালেও তেলের জন্য এত বড় লাইন আগে কখনো দেখেননি। তার মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় অনেকেই আগেভাগে তেল মজুত করার চেষ্টা করছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন–এর রাজশাহী শাখার সভাপতি মনিমুল হক বলেন, বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তবে শুক্রবার ও শনিবার ছুটির দিন হওয়ায় ডিপো থেকে সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। সেই কারণে গ্রাহকদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সীমিত পরিমাণে জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি গ্রাহক পাম্পে আসছেন। এতে ভিড় ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর এতটাই চাপ তৈরি হয়েছিল যে পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু সময়ের জন্য পাম্প বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পরে আজ সকাল থেকে আবার নিয়মিতভাবে জ্বালানি সরবরাহ শুরু করা হয়েছে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাবেই রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি কিনতে আগাম ভিড় দেখা যাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এই অস্বাভাবিক চাপ কমে আসবে বলে আশা করছেন পাম্প মালিকরা।