রাত তখন সাড়ে দশটা।সারা পাড়া প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু রহমান সাহেবের ঘরের বাতিটা জ্বলছে। তিনি টেবিলের ওপর কিছু পুরোনো নোট, কয়েন আর একটা ছোট্ট খাতা নিয়ে বসে আছেন।
খাতার এক পাশে লেখা-বাড়ি ভাড়া, অন্য পাশে ছেলের কলেজের ফি, আর নিচে,মায়ের ওষুধ।
সব হিসাব শেষ করে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর পকেট থেকে একটি কাগজ বের করলেন, সেটি ছিল তাঁর বহুদিনের ইচ্ছার একটি মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপন।
কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে কাগজটা ভাঁজ করে আবার ড্রয়ারে রেখে দিলেন।
ঠিক তখনই তাঁর মেয়ে নীলা ঘুম ভেঙে পানি খেতে এসে বাবাকে দেখে বলল,— আব্বু, এখনো ঘুমাওনি?রহমান সাহেব হেসে বললেন,— এই তো, একটু হিসাব করছিলাম।নীলা আর কিছু বুঝল না, কিন্তু সেই রাতের দৃশ্যটা তার মনে গেঁথে রইল।বছর গড়াতে লাগল।নীলা বড় হতে থাকল, আর বাবার চুলে সাদা রঙ বাড়তে লাগল।বাড়িতে কোনোদিন অভাবের গল্প হতো না। কিন্তু নীলা লক্ষ্য করত, নতুন জামা কেনার সময় বাবা সবসময় বলতেন,আমারটা পরে হবে।
মা বলতেন,আমার আলমারিতে তো অনেক শাড়ি আছে।অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেই “পরে” আর কোনোদিন আসত না।একদিন নীলা মাকে জিজ্ঞেস করেছিল,— তুমি নিজের জন্য কিছু কিনো না কেন? মা হেসে বলেছিলেন,— সবকিছু নিজের জন্য কিনলে সংসার হয় না মা, সংসার হয় সবাইকে নিয়ে।সেদিন কথাটা নীলা বুঝতে পারেনি।জীবন কাউকে জোর করে শেখায় না, সময় এলে শুধু আয়নাটা সামনে ধরে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর নীলা প্রথম বুঝল, তার অনেক বন্ধু এমন একটা পৃথিবী থেকে এসেছে যেখানে কোনো কিছু চাইলে পাওয়া যায়।আর সে এসেছে এমন একটা পরিবার থেকে, যেখানে কিছু চাওয়ার আগে মানুষ দু’বার ভাবে—এটা সত্যিই দরকার, নাকি শুধু ইচ্ছা?
প্রথম প্রথম নিজের পরিবারকে খুব সাধারণ মনে হতো তার।পরে বুঝল, সাধারণ নয়-এরা অসাধারণ।কারণ যার ঘরে সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু অভিযোগ নেই, যার ঘরে কম আছে, কিন্তু ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ আছে, সেই ঘরই সবচেয়ে ধনী।চাকরি পাওয়ার দিন প্রথম বেতন হাতে নিয়ে নীলা অনেক পরিকল্পনা করেছিল।
নিজের জন্য একটা দামি ফোন কিনবে।অনেক দিনের শখের একটা ঘড়ি কিনবে।বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে যাবে।কিন্তু বেতনের টাকা হাতে নিয়ে বাসায় ফিরতেই দেখল, বাবা আগের সেই পুরোনো চশমাটা দিয়েই খবরের কাগজ পড়ছেন, কাঁচে এত দাগ যে অক্ষরগুলোও ঠিকমতো দেখা যায় না।
মা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে পুরোনো চুলাটাকে বারবার ঠিক করার চেষ্টা করছেন।সেদিন রাতেই নীলা বুঝে গেল—শৈশব মানুষকে কখনো ছেড়ে যায় না।পরদিন নিজের জন্য কিছুই কেনেনি সে।বাবার জন্য নতুন চশমা, মায়ের জন্য একটি সাধারণ শাড়ি আর রান্নাঘরের জন্য একটি নতুন চুলা কিনে বাড়ি ফিরেছিল।
মা অবাক হয়ে বলেছিলেন,— তুই নিজের জন্য কিছু নিলি না?নীলা শুধু হেসে বলেছিল,— আমাকে তো তোমরাই শিখিয়েছ, নিজের আগে আপন মানুষ।টাকা নয়। তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো একে অপরের জন্য বেঁচে থাকার অভ্যাস।এই ঘরের মানুষগুলো কখনো উচ্চস্বরে ভালোবাসি বলে না।তারা ভালোবাসা প্রকাশ করে গরম ভাতের শেষ টুকরোটা অন্যের প্লেটে তুলে দিয়ে।নিজের নতুন জুতোর টাকা বাঁচিয়ে সন্তানের বই কিনে দিয়ে।
মাসের শেষে হিসাব না মিললেও অতিথির সামনে হাসিমুখে এক কাপ চা এগিয়ে দিয়ে।তাদের জীবনটা নদীর মতো…শব্দ কম, গভীরতা বেশি।একদিন বৃদ্ধ রহমান সাহেব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন।
ডাক্তার বললেন, বিশ্রাম দরকার।নীলা বাবার হাত ধরে বসেছিল।হঠাৎ সে লক্ষ্য করল, বাবার দুই হাতের তালু কতটা শক্ত হয়ে গেছে।এই হাতই তাকে হাঁটতে শিখিয়েছে।এই হাতই নিজের ইচ্ছাগুলোকে আড়াল করে তার ভবিষ্যৎ গড়েছে।এই হাতই কখনো খালি থাকলেও সন্তানদের স্বপ্ন খালি রাখেনি।
নীলার মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি অলংকার কোনো সোনার আংটি নয়।বাবার হাতের এই কড়াগুলোই সবচেয়ে মূল্যবান।কারণ প্রতিটি কড়ার ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজারো অপূর্ণ ইচ্ছা, হাজারো নির্ঘুম রাত আর অসংখ্য নিঃশব্দ ভালোবাসা।
আজ নীলা নিজেও একজন মা।মাঝেমধ্যে তার ছেলে কোনো খেলনা চাইলে সে একটু থেমে যায়।তারপর হঠাৎ নিজের বাবার কথা মনে পড়ে।মায়ের মুখটা মনে পড়ে।সেই ছোট্ট বাড়িটা মনে পড়ে, যেখানে স্বপ্নগুলো খুব বড় ছিল না, কিন্তু মানুষগুলো ছিল বিশাল।তখন সে বুঝতে পারে—মধ্যবিত্ত হওয়া কোনো পরিচয় নয়- এটা একটি চরিত্র।এটা এমন এক শিক্ষা, যেখানে মানুষ আগে কৃতজ্ঞ হতে শেখে, তারপর সফল হতে শেখে।যেখানে নিজের চেয়ে পরিবারের হাসির দাম বেশি।
যেখানে “আমি” শব্দটা ধীরে ধীরে “আমরা” হয়ে যায়।হয়তো এই কারণেই মধ্যবিত্ত মানুষগুলো পৃথিবীকে খুব বেশি বদলাতে পারে না।কিন্তু তারা মানুষ তৈরি করে।
এমন মানুষ, যারা কষ্ট পেয়েও নিষ্ঠুর হয় না।কম পেয়েও অকৃতজ্ঞ হয় না।হেরে গিয়েও অন্যের জয়ের জন্য হাততালি দিতে জানে।এই পৃথিবীতে বড় বড় অট্টালিকা অনেকেই বানাতে পারে।
কিন্তু একটি ছোট ঘরকে ভালোবাসা, সম্মান, ত্যাগ আর মমতার আশ্রয়ে পরিণত করতে পারে খুব অল্প মানুষ।সেই অল্প মানুষের নামই-মধ্যবিত্ত।আর পৃথিবী যতদিন মানুষের হৃদয়ের মূল্য দেবে, ততদিন মধ্যবিত্তের গল্প কখনো পুরোনো হবে না।
কারণ ইতিহাস রাজাদের নাম মনে রাখে, কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে সেইসব সাধারণ মানুষের কাঁধে, যারা প্রতিদিন নিজের ইচ্ছাকে একটু সরিয়ে রেখে প্রিয় মানুষগুলোর স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে।