সরকারি নথিতে তিনি একজন ‘নিখোঁজ’ চিকিৎসক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল এবং কক্সবাজার সদর হাসপাতালের দাপ্তরিক চিঠি চালাচালির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেই বিসিএস কর্মকর্তা ডা. জাসটিন ক্লাম্প বর্তমানে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজে রেডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরি থেকে আনুষ্ঠানিক অব্যাহতি বা পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার আগেই তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক প্রজ্ঞাপনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলজিস্ট ডা. জাসটিন ক্লাম্পকে কক্সবাজার ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালে বদলি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশনা থাকলেও তিনি সেখানে যোগ দেননি।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মং টিং ঞো ২০২৫ সালের ১১ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বদলির ১১৮ দিন পার হলেও ডা. জাসটিন কর্মস্থলে যোগদান করেননি। এর আগে ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শৃঙ্খলা বিভাগ থেকেও তার অননুমোদিত অনুপস্থিতির বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন বলেন, বদলি আদেশের পর নিয়ম অনুযায়ী তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। এরপর তিনি কোথায় আছেন বা কেন যোগদান করেননি, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো তথ্য নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডা. জাসটিন সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সরকারি বেতন গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই তিনি সরকারি হাজিরা ও বেতন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। যদিও সরকারি বিধি অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় কর্তৃক পদত্যাগপত্র গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত তিনি একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবেই বিবেচিত।
এদিকে, গত ১১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে তিনি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে ডা. জাসটিন ক্লাম্প বলেন, তিনি সরকারি চাকরি আর করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সে কারণে কক্সবাজারে যোগদান করেননি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। তবে পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার কোনো চূড়ান্ত কাগজপত্র তার কাছে নেই বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, “সরকারি চাকরি ছাড়ার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ। অনেক টেবিল ঘুরতে হয়। প্রক্রিয়াটি এখনও চলমান।”
এদিকে, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজে তার নিয়োগ নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ইন্টারভিউ, নিয়োগ বোর্ড কিংবা আনুষ্ঠানিক ভাইভা নেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রভাবশালী একটি মহলের মাধ্যমে তাকে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট এস এম দিদার উদ্দিন বলেন, “কোনো সরকারি কর্মকর্তা পদত্যাগপত্র জমা দিলেই চাকরি থেকে অব্যাহতি পান না। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে যোগদান আইনসম্মত নয়। একই সঙ্গে এনওসি যাচাই ছাড়া নিয়োগ দেওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটিরও দায় রয়েছে।”
ঘটনাটি এখন স্বাস্থ্য প্রশাসন ও চিকিৎসক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।