রাজশাহীর গাছে গাছে এখন লাল-সবুজের উৎসব। আগাম দেশি লিচুর মৌসুম শেষ হতে না হতেই বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সুস্বাদু ও আকর্ষণীয় বোম্বাই লিচু। ফলের আকার, রঙ, স্বাদ এবং বাজারদরের ইতিবাচক অবস্থানে উচ্ছ্বসিত চাষি, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা। কৃষি বিভাগের হিসাব বলছে, অনুকূল বাজার পরিস্থিতি বজায় থাকলে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে প্রায় ৫৬ কোটি টাকার লিচু বাণিজ্য হতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রাজশাহীর ৯টি উপজেলায় ৫২৮ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হয়েছে। দেশি ও বোম্বাই জাত মিলিয়ে ৩ হাজার ৭৭৫ মেট্রিক টন লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন যেমন বেড়েছে, তেমনি উন্নত হয়েছে ফলের গুণগত মানও।
মৌসুমের শুরুতে তীব্র তাপপ্রবাহ কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি করলেও পরবর্তীতে অনুকূল আবহাওয়া ও সময়মতো বৃষ্টিপাত লিচুর জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। ফলে অধিকাংশ বাগানে ফলের আকার, রঙ ও স্বাদ প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হয়েছে। বিশেষ করে বোম্বাই লিচুর মানে সন্তুষ্ট পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকেই লিচু কিনে নিচ্ছেন।
চারঘাট উপজেলার লিচুচাষি শিমুল জানান, কয়েক বছরের মধ্যে এবারই পোকার আক্রমণ সবচেয়ে কম হয়েছে। দেশি লিচু বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়ার পর এখন বোম্বাই লিচু বাজারজাত করছেন। ফলের গুণগত মান ভালো হওয়ায় বাগান থেকেই পাইকাররা লিচু সংগ্রহ করছেন।
নগরীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় ৪০টি গাছে লিচু চাষ করা হানিফ মাহমুদ বলেন, এ বছর ফলন আশাতীত হয়েছে। বাজারে সরবরাহ ভালো থাকলেও দাম এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মৌসুম শেষে উল্লেখযোগ্য লাভের আশা করছেন তিনি।
এদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা রাজশাহীতে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন। কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, বোম্বাই লিচুর চাহিদা বর্তমানে তুঙ্গে। ফলের মান ভালো হওয়ায় বাজারেও দাম সন্তোষজনক রয়েছে এবং মৌসুমের শেষ পর্যন্ত ব্যবসা আরও জমজমাট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশি লিচুর মৌসুম প্রায় শেষ পর্যায়ে। বাজারজুড়ে এখন বড় আকারের রসালো বোম্বাই লিচুর আধিপত্য। খুচরা বাজারে প্রতি ১০০টি উন্নতমানের লিচু বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। একইসঙ্গে পাইকারি বাজারেও জমে উঠেছে কেনাবেচা। প্রতিদিন শত শত ট্রাকভর্তি লিচু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।
তবে বাম্পার ফলনের আনন্দের মাঝেও কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে চাষিদের। সাম্প্রতিক সময়ে অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে জেলার কিছু এলাকায় কাঁচা ও আধাপাকা লিচু ফেটে যাওয়ার ঘটনা দেখা দিয়েছে। কয়েকদিনের তীব্র গরমের পর আকস্মিক আর্দ্রতা বৃদ্ধির ফলে ফলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে এ সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
পবা উপজেলার চাষি আব্দুল মালেক বলেন, কিছু বাগানে লিচু ফেটে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিলেও সঠিক পরিচর্যা এবং নিয়মিত সেচের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, মৌসুমের শুরুতে কিছু এলাকায় খরার প্রভাবে লিচু ফেটে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। কৃষকদের হালকা সেচ ও গাছের গোড়ায় মালচিং করার পরামর্শ দেওয়ার ফলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদন আরও ভালো হবে এবং কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত লাভ পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী বলেন, উৎপাদন ও গুণগত মান—দুই ক্ষেত্রেই এ বছর রাজশাহীর লিচু আশাব্যঞ্জক অবস্থানে রয়েছে। বাজারে বোম্বাই লিচুর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে এবং পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করছেন। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে প্রায় ৫৬ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। এর সুফল শুধু বাগান মালিকরাই নয়, আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট হাজারো মানুষও পাবেন।
বাম্পার ফলন, শক্তিশালী বাজার চাহিদা এবং দেশব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে ইতোমধ্যে রাজশাহীর গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কৃষক থেকে ব্যবসায়ী—সবার চোখে এখন নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে মৌসুমের শেষ পর্যন্ত অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকাই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।