রংপুর জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে সংরক্ষিত বালাম বই থেকে জমির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিশেষ করে সাবেক ও হাল দাগ নম্বর পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অর্থের বিনিময়ে এ ধরনের কাজ করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করতে অফিস-সংশ্লিষ্ট এক নকলনবীসের সঙ্গে ফোনে কথা বলে এমনই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ।
অনুসন্ধানে কথা হয় মোঃ মমিদুল ইসলাম নামে এক নকলনবীসের সঙ্গে। তিনি হাজিরহাট এলাকায় বসবাস করেন বলে জানা গেছে। ফোনালাপে দাগ নম্বর পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি একেবারে নাকচ না করে প্রথমে দলিল নম্বর, সাল এবং দলিলের প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠার ছবি মোবাইলে পাঠাতে বলেন। একই সঙ্গে প্রাথমিকভাবে ৫০০ টাকা দেওয়ার কথাও জানান বলে অভিযোগ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বালাম বই কীভাবে বের করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে কী করতে হবে—সে বিষয়েও ফোনালাপে কথা হয়। বালাম দেখে প্রয়োজনীয় বিষয় বুঝে ‘স্যার’-এর সঙ্গে কথা বলে দাগ নম্বর পরিবর্তনের জন্য কত টাকা লাগবে তা জানানো হবে—এমন বক্তব্যও পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
তবে অনুসন্ধানের স্বার্থে ওই নকলনবীসকে কোনো টাকা বা প্রয়োজনীয় দলিলের তথ্য দেওয়া হয়নি। ফোনালাপে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে অনুসন্ধানে ওই নকলনবীসের কাছে জানতে চাওয়া হয়—বালাম বইয়ে থাকা জমির পুরোনো বা বর্তমান দাগ নম্বর পরিবর্তন করা যায় কি না। এর জবাবে তিনি বিষয়টি সম্ভব নয় বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য পাঠাতে বলেন।
দলিল নম্বর, সাল এবং দলিলের প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠার ছবি চাওয়ার পাশাপাশি বালাম বের করার বিষয়েও কথা বলেন তিনি। প্রাথমিকভাবে ৫০০ টাকা এবং পরে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও অর্থ লাগতে পারে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় কথোপকথনে।
বালাম বই দেখার পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ‘স্যার’-এর সঙ্গে আলোচনা করে কত টাকা প্রয়োজন হবে, তা জানানো হবে বলেও তিনি জানান বলে অভিযোগ।এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন—যদি দাগ নম্বর পরিবর্তনের কোনো বৈধ সুযোগ না থাকে, তাহলে কীসের ভিত্তিতে অর্থের বিনিময়ে কাজটি করে দেওয়ার বিষয়ে কথা বলা হলো?আরেক নকলনবীস বললেন, আদালতের আদেশ ছাড়া অসম্ভব বিষয়টি যাচাই করতে অন্য এক নকলনবীসের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দেন। তার ভাষ্য, কোনো দলিলে পরিবর্তন করতে হলে আদালতের আদেশ প্রয়োজন। আদালতের আদেশ ছাড়া দলিলের তথ্য পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।
দুই নকলনবীসের বক্তব্যের এই পার্থক্যই বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। জেলা রেজিস্ট্রার: আদালতের আদেশ ছাড়া পরিবর্তনের সুযোগ নেইঅভিযোগের বিষয়ে রংপুর জেলা রেজিস্ট্রারের বক্তব্য নেওয়া হয়। তিনি স্পষ্ট করে জানান, সংশোধন দলিল ও আদালতের আদেশ ছাড়া দলিলের তথ্য পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।কেউ এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।জেলা রেজিস্ট্রারের এই বক্তব্যের পরও প্রশ্ন থেকে যায়—অফিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি যদি সাধারণ মানুষকে অর্থের বিনিময়ে এমন কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেন, তাহলে তিনি কীসের ওপর নির্ভর করে এমন কথা বলছেন?
অনুমতি ছাড়া বালাম বের করার কথা কীভাবে সম্ভব?বালাম বই রেজিস্ট্রি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত নথি। সাধারণ নিয়মে এসব নথি নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা রেকর্ড কিপারের অনুমতি নিয়ে বের করার কথা।কিন্তু অনুসন্ধানে কথা বলা নকলনবীসের বক্তব্যে অনুমতি ছাড়া বালাম বের করে দেওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ।তাহলে প্রশ্ন উঠছে—রেকর্ড কিপারের অনুমতি ছাড়া যদি বালাম বই বের করার সুযোগ না থাকে, একজন নকলনবীস কীভাবে তা বের করার কথা বলেন?এটি কি কেবল একজন ব্যক্তির কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি অফিসের নথি ব্যবস্থাপনায় কোনো দুর্বলতা রয়েছে—তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
বালাম বের করতে ১০০ থেকে ১ হাজার টাকা?রেজিস্ট্রি অফিসে পুরোনো দলিলের তথ্য দেখতে বা বালাম বই বের করতে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ওমেদার ও পিয়নদের কেউ কেউ দলিলের সাল ও প্রয়োজন অনুযায়ী বালাম বই বের করা বা দেখানোর জন্য ১০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা তদন্তের বিষয়।
অফিস ঘিরে দালালচক্রের দাপট রংপুর জেলা রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে একটি শক্তিশালী দালালচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে, বাইরের কিছু ব্যক্তি অফিসের বিভিন্ন স্থানে অবাধে চলাফেরা করেন। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড সংরক্ষণের জায়গার আশপাশেও তাদের উপস্থিতি দেখা যায়।সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন কাজে মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে অনেককে।অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকরা অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে এসব কথিত দালালের কেউ কেউ বাধা দেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘দেখে নেওয়ার’ মতো হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
সরকারি ফির তালিকা কোথায়?রেজিস্ট্রি অফিসে বিভিন্ন সেবার জন্য সরকার নির্ধারিত ফি রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিযোগ, অফিসে সহজে চোখে পড়ার মতো স্থানে সরকারি ফির পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেখা যায় না।ফলে একজন সেবাগ্রহীতা কোন কাজের জন্য সরকারকে কত টাকা দেবেন এবং কোনো কর্মচারী বা মধ্যস্থতাকারী অতিরিক্ত অর্থ চাইলে সেটি বৈধ কি না—তা বোঝার সুযোগ কমে যায়।
স্বচ্ছতার স্বার্থে অফিসে দৃশ্যমান স্থানে সব ধরনের সরকারি ফি, সেবা ও প্রয়োজনীয় নিয়মাবলি টাঙিয়ে রাখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগেও বালাম বই নিয়ে অভিযোগ বালাম বই নিয়ে রংপুর রেজিস্ট্রি অফিসে এর আগেও অভিযোগ ওঠার তথ্য রয়েছে।
এর আগে এক নারী নকলনবীসের বিরুদ্ধে বালাম বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ওই নকলনবীস চাকরি হারান বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া প্রায় দুই মাস আগে এক পিয়নের বিরুদ্ধে বালাম বইয়ে জমির পরিমাণসংক্রান্ত তথ্য পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বারবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় বালাম বই সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তদন্তে যা খতিয়ে দেখা জরুরি সাম্প্রতিক অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রথমত, বালাম বই কে, কী প্রক্রিয়ায় এবং কার অনুমতিতে রেকর্ড রুম থেকে বের করেন। দ্বিতীয়ত, কোনো বহিরাগত বা নকলনবীসের সেখানে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে কি না। তৃতীয়ত, বালাম বইয়ের তথ্য পরিবর্তনের কোনো সুযোগ বা পদ্ধতি বাস্তবে রয়েছে কি না।
এর পাশাপাশি অনুসন্ধানে উঠে আসা নকলনবীসের বক্তব্য, বালাম বের করার বিষয়ে তার দাবি এবং অর্থ চাওয়ার অভিযোগও যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বালাম বই, রেকর্ড রুমের প্রবেশ-নিবন্ধন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বের নথি এবং অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করেও বিষয়টি যাচাই করা যেতে পারে।
শুধু বদলি নয়, জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি রেজিস্ট্রি অফিসে সংরক্ষিত বালাম বই শুধু একটি পুরোনো নথি নয়; জমির মালিকানা ও দলিলের ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এসব নথির গুরুত্ব অনেক।
তাই বালাম বইয়ের কোনো তথ্য অর্থের বিনিময়ে পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে—এমন অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর অনিয়ম। আবার অভিযোগটি সত্য না হলে কীভাবে এমন বক্তব্য একজন অফিস-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দিলেন, সেটিও তদন্ত করে পরিষ্কার করা দরকার।
অভিযোগের সত্যতা বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং বালাম বই সংরক্ষণে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই—রেজিস্ট্রি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথি যদি নিরাপদই থাকে, তাহলে অনুমতি ছাড়া বালাম বের করার কথা বলার সুযোগ কোথা থেকে আসে? আর যদি সুযোগ না থাকে, তাহলে এমন আশ্বাস দিয়ে অর্থ চাওয়ার পেছনে কারও যোগসাজশ আছে কি না—তা খুঁজে বের করবে কে?