জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া শুধু দায়িত্বহীনতা নয়, এটি চরম অমানবিকতারও বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে যখন সেই ব্যক্তি দেশের মানুষের কাছে পরিচিত, শ্রদ্ধেয় এবং দীর্ঘদিন ধরে জনকল্যাণে কাজ করে আসা একজন মানুষ, তখন তাঁর মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ কতটা গভীরভাবে মানুষের মনে আঘাত করতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। সম্প্রতি নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় এমনই একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ইলিয়াস কাঞ্চন মারা যাননি। তিনি লন্ডনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং ভালো আছেন। তাঁর মৃত্যুর খবরটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব। এ ধরনের মিথ্যা সংবাদে নিরাপদ সড়ক চাই পরিবারের নেতাকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী, তাঁর পরিবার এবং দেশের অসংখ্য মানুষ স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা নিয়ে যখন পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা উদ্বেগের মধ্যে থাকেন, তখন তাঁর মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া তাদের জন্য কতটা কষ্টদায়ক হতে পারে, তা উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
ইলিয়াস কাঞ্চন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের একজন জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে যেমন মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন, তেমনি নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের একজন সাহসী ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনের এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর যে সামাজিক আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ একটি জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়, এটি এখন দেশের মানুষের নিরাপদে চলাচলের অধিকার ও প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সামাজিক দাবি।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইলিয়াস কাঞ্চন সড়ক নিরাপত্তার জন্য কথা বলে যাচ্ছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু, চালকের অদক্ষতা, যানবাহনের অনুপযুক্ততা, ট্রাফিক আইন অমান্য, পথচারীর অসচেতনতা এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতার বিরুদ্ধে তিনি নিয়মিত জনমত গড়ে তুলেছেন। কখনো সভা-সমাবেশে, কখনো সেমিনারে, কখনো গণমাধ্যমে, আবার কখনো মাঠপর্যায়ে মানুষের কাছে গিয়ে তিনি নিরাপদ সড়কের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো একজন মানুষের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়া তাই শুধু ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে নিয়ে একটি মিথ্যা তথ্য প্রচার নয়। এর সঙ্গে একটি দীর্ঘ সামাজিক আন্দোলনের আবেগও জড়িয়ে আছে। নিসচা’র সড়কযোদ্ধারা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে ইলিয়াস কাঞ্চন একটি অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর অসুস্থতার খবরেই যখন মানুষ উদ্বিগ্ন, তখন মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে গুজব ছড়ানো অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি পোস্ট হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কেউ একজন যাচাই না করে একটি তথ্য প্রকাশ করলেন, আর অন্যরা সেটি সত্য ধরে নিয়ে শেয়ার করলেন। এভাবেই একটি মিথ্যা তথ্য মুহূর্তের মধ্যে বড় আকার ধারণ করে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক মানুষ তথ্যের উৎস যাচাই না করেই আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন খবর প্রচার করেন।
মৃত্যুর সংবাদ অন্য যেকোনো সংবাদের তুলনায় অনেক বেশি স্পর্শকাতর। একটি ভুল মৃত্যুসংবাদ একটি পরিবারের সদস্যদের জন্য যে মানসিক আঘাত সৃষ্টি করতে পারে, তা কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। স্বজনেরা আতঙ্কিত হন, বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীরা উৎকণ্ঠায় পড়েন এবং একজন মানুষের সামাজিক পরিচিতির কারণে হাজার হাজার মানুষ বিভ্রান্ত হন।
সাংবাদিকতা ও সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। একটি সংবাদ দ্রুত প্রকাশ করার চেয়ে সঠিক সংবাদ প্রকাশ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু বা গুরুতর অসুস্থতার মতো বিষয়ে তথ্য প্রকাশের আগে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া অপরিহার্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া কোনো পোস্ট কখনোই নির্ভরযোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না।
মনে রাখতে হবে, সংবাদ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। একটি সঠিক সংবাদ মানুষকে সচেতন করতে পারে, আবার একটি ভুল সংবাদ মানুষকে আতঙ্কিত ও বিভ্রান্ত করতে পারে। তাই সংবাদ পরিবেশনের সঙ্গে নৈতিক দায়িত্বও জড়িত। এই দায়িত্ব সংবাদকর্মীর যেমন, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী প্রত্যেক নাগরিকেরও।
ইলিয়াস কাঞ্চনের মৃত্যুর গুজব আমাদের সামনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে। আমরা কি তথ্যের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ করছি? আমরা কি কোনো খবর দেখেই তা শেয়ার করে দিচ্ছি? আমরা কি একবারও ভাবছি, আমাদের শেয়ার করা তথ্যটি সত্য না হলে এর পরিণতি কী হতে পারে?
একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় তাঁর মৃত্যু। এই বিষয়কে কোনোভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘কনটেন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা, আলোচনায় আসার জন্য মিথ্যা তথ্য ছড়ানো কিংবা যাচাইহীন সংবাদ প্রচার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ইলিয়াস কাঞ্চন বর্তমানে লন্ডনে চিকিৎসাধীন। তাঁর চিকিৎসা ও সুস্থতার বিষয়টি তাঁর পরিবার, সংগঠন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে তাঁর জন্য প্রয়োজন মানুষের দোয়া ও শুভকামনা। মৃত্যুর গুজব নয়, তাঁর দ্রুত আরোগ্যের জন্য আন্তরিক প্রার্থনাই হওয়া উচিত সবার দায়িত্বশীল আচরণের পরিচয়।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সঙ্গে ইলিয়াস কাঞ্চনের সম্পর্ক শুধু সাংগঠনিক নয়, এটি তাঁর জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের অংশ। সড়কে মানুষের জীবন রক্ষার জন্য তিনি যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতা আজও চলছে। সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠে কাজ করছেন, সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, চালকদের প্রশিক্ষণ, পথচারীদের সচেতনতা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে জনমত গঠনে কাজ করছেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন যে প্রাণহানি ঘটে, তা কোনো পরিসংখ্যানের সংখ্যা মাত্র নয়। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি ভবিষ্যৎ। একজন বাবা হারান তাঁর সন্তানকে, একজন সন্তান হারায় তাঁর বাবা-মাকে, একজন স্ত্রী হারান তাঁর জীবনসঙ্গীকে। তাই সড়ক নিরাপত্তার আন্দোলন মূলত মানুষের জীবন ও পরিবারের ভবিষ্যৎ রক্ষার আন্দোলন।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, চলচ্চিত্র ও দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইলিয়াস কাঞ্চনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । তাঁর মিথ্যা মৃত্যুসংবাদ ছড়ানো মাধ্যমে তাঁকে অসম্মান করা হয়েছে। বরং তাঁর জীবনের ভালো কাজগুলোকে সম্মান করা উচিত। আমাদের দায়িত্ব নিরাপদ সড়কের দাবিকে আরও শক্তিশালী করা এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা।
গুজবের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কোনো সংবাদ যাচাই না করে শেয়ার না করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে তথ্য যাচাইয়ের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও বুঝতে হবে যে, একটি শেয়ারও অনেক সময় বড় ধরনের সামাজিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ইলিয়াস কাঞ্চনের মৃত্যুর গুজব হয়তো কিছু সময়ের জন্য মানুষকে আতঙ্কিত করেছে, কিন্তু এই ঘটনা আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা রেখে গেছে। সেটি হলো, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দায়িত্বশীলতাও বাড়াতে হবে। তথ্যের গতি যত বাড়বে, তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনও তত বাড়বে।
ইলিয়াস কাঞ্চন জীবিত আছেন, লন্ডনে চিকিৎসাধীন আছেন এবং ভালো আছেন। তাঁর মৃত্যুর খবর সম্পূর্ণ গুজব। এই গুজবে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং তাঁর দ্রুত সুস্থতার জন্য সবাইকে আন্তরিকভাবে দোয়া ও শুভকামনা জানানো উচিত।
ইলিয়াস কাঞ্চন তাঁর জীবনের বেদনাকে মানুষের জীবন রক্ষার আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন, তাঁর প্রতি আমাদের দায়িত্ব গুজব ছড়ানো নয়, তাঁর পাশে দাঁড়ানো। তাঁর জন্য দোয়া করা এবং তাঁর স্বপ্নের নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
গুজব নয়, সত্যকে প্রচার করি। অপপ্রচার নয়, মানবিকতাকে ধারণ করি। আমাদের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় মানুষ ইলিয়াস কাঞ্চন ভালো আছেন, তাঁর পরিপূর্ণ সুস্থতার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দোয়া করব, হে মহান আল্লাহ, ইলিয়াস কাঞ্চন ভাইসহ আমাদেরকে পরিপূর্ণ সুস্থতা, হেদায়েত ও দীর্ঘায়ু দান করুন, আমীন