“নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব।” প্রতিদিন কতশত তরুন প্রান ঝরে যায় মাদকের এই মহামারিতে একটি পরিবার হারায় তাদের আদরের সন্তান, বন্ধু হারায় বন্ধুকে, সমাজ হারায় একজন সম্ভাবনাময় যুবক। গত দুই বছরে আমাদের এলাকায় একের পর এক এমন কয়েকটি মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
কোনো মৃত্যুই শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়- এটি পুরো সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যদি সত্যিই মাদকাসক্তি, মানসিক সংকট, হতাশা কিংবা সামাজিক অবহেলা একজন তরুণকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে সেই দায় কেবল একজন মানুষের নয়।পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, রাষ্ট্র—সবারই আত্মসমালোচনা করা উচিত।
মাদক: একটি নীরব মহামারি–মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না, এটি ধ্বংস করে একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম, একটি জাতির ভবিষ্যৎ।
একজন তরুণ যখন মাদকের জালে আটকে পড়ে, তখন তার স্বপ্ন, শিক্ষা, কর্মজীবন, সম্পর্ক, সবকিছু ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
অনেকেই হতাশা, অপরাধ, সহিংসতা কিংবা আত্মবিধ্বংসী সিদ্ধান্তের দিকে চলে যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে,এই মাদক আসে কোথা থেকে? কারা এর ব্যবসা করে? কারা এর পৃষ্ঠপোষক? কেন বারবার অভিযান হয়, অথচ মাদকের বিস্তার কমে না?
মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতি–কয়েকটি টাকার জন্য আপনারা কত শত পরিবারের চোখের আলো নিভিয়ে দিচ্ছেন, একটি সন্তানের মৃত্যুতে যে মায়ের বুক খালি হয়ে যায়, যে বাবা সারাজীবন অপরাধবোধে ভোগেন, যে ছোট ভাই বা বোন আজীবন একজন অভিভাবক হারায়, তার মূল্য কি কোনো অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা সম্ভব?
একটি প্রাণের মূল্য পৃথিবীর সব সম্পদের চেয়েও বেশি।
পরিবারের করণীয়–পরিবারই একজন সন্তানের প্রথম বিদ্যালয়।সন্তানদের সময় দিন, তাদের কথা মন দিয়ে শুনুন।তারা কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, সেদিকে নজর রাখুন।শুধুমাত্র পড়াশোনার ফল নয়, তাদের মানসিক অবস্থারও খোঁজ নিন।সন্তান ভুল করলে তাকে দূরে ঠেলে না দিয়ে পাশে দাঁড়ান।
প্রয়োজনে চিকিৎসক, কাউন্সেলর বা আসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সাহায্য নিন।
সমাজের করণীয়, একটি সুস্থ সমাজ কখনো একজন তরুণকে একা ফেলে রাখে না।মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক কার্যক্রমে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে।মাদক বিক্রি ও সেবনের খবর গোপন না রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে।আসক্ত মানুষকে ঘৃণা নয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে।
সরকারের করণীয়,রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অভিযান পরিচালনা নয়- একটি দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
মাদক উৎপাদন, পাচার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় না দেখে কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে।
সীমান্তে নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করতে হবে।প্রতিটি জেলায় আধুনিক আসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে হবে, যাতে হতাশাগ্রস্ত মানুষ সময়মতো সহায়তা পায়।
তরুনদের প্রতি আহ্বান,জীবন একবারই পাওয়া যায়।বন্ধুর চাপে, কৌতূহলে কিংবা সাময়িক আনন্দের জন্য কখনো মাদকের দিকে হাত বাড়াবেন না। সমস্যায় পড়লে নীরব থাকবেন না।
পরিবার, শিক্ষক, বিশ্বস্ত বন্ধু বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন।সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, বরং সেটিই সাহসের পরিচয়।
আমাদের অঙ্গীকার–আমরা চাই না আর কোনো মা তার সন্তান হারাক।আমরা চাই না আর কোনো বাবা সন্তানের লাশ কাঁধে নিক।আমরা চাই না আর কোনো তরুণের স্বপ্ন মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যাক।
আজই সময় মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার।পরিবার, সমাজ, প্রশাসন, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।কারণ একটি প্রজন্মকে রক্ষা করা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
মহান আল্লাহ আমাদের সমাজকে মাদকের অভিশাপ থেকে রক্ষা করেন। আমীন।