ময়মনসিংহে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে সেবাগ্রহীতাকে হয়রানী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকট থেকে ঘুস নিলেও রহস্য জনকভাবে এর দায় উপজেলা শিক্ষা অফিসের উপর চাপিয়ে দিয়ে বদনাম তৈরী করে সদর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মনিকা পারভীনকে বদলী করে নান্দাইল উপজেলায় পদায়ন করার ঘটনায় বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। মনিকা পারভীনের দক্ষতায় ও জিরোটলারেন্স নীতির কারণে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কার্যক্রমে ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মানোন্নয়নে গতি ফিরিয়ে আনতে তার কঠোরতার ফলে এটাকে এক ধরনের ষড়যন্ত্র হিসাবে দেখছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ অভিভাবকগণ। সদরের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই বদলীর আদেশ স্থগিতের দাবীও জানিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও অভিভাবকরা। বাদীর দেওয়া সাক্ষাতকারে ঘুষের সাথে সম্পৃক্ততা নেই এই কর্মকর্তার, তবুও তার উপর এমন বিভ্রান্তিকর অভিযোগ তুলে বদলী করায় শিক্ষক ও কর্মচারী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভ তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক অফিস আদেশে মনিকা পারভীনকে নান্দাইলে বদলী করা হয়। একই আদেশে নান্দাইল উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছা কে সদর উপজেলায় পদায়ন করা হয়েছে। জনস্বার্থে’ এই বদলি বলে উল্লেখ করা হলেও ঘুষ দাবির অভিযোগে তিনি তার অফিসের দুই কর্মচারীকে শোকজ করার পর তাকেই বদলীর আদেশ করায় বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। শোকজের অভিযোগের তদন্ত প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই তাকে কেন বদলি করা হলো, তা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। তারা বলছেন, সৎ ও নির্লোভ এ কর্মকর্তার বদলিতে ময়মনসিংহ সদরের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ঝিমিয়ে পড়তে পারে।
অথচ এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগকারী ঘুষ.সাইট’ নামক ওয়েবসাইট এর নির্মাতা শাহেদ এর বাবা শরীফুল ইসলামের দেয়া এক ভিডিও সাক্ষাতকারের ভাষ্য মতে- তিনি তার মৃত স্ত্রীর সরকারি পাওনার ১০ লাখ টাকা তুলতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে সোহেল রানা নামক এক কর্মচারী তার কাছে এক লাখ টাকা ঘুষ চেয়েছিল। বিষয়টি ভূল বুঝাবুঝির মাধ্যমে উপজেলা শিক্ষা অফিসের দুই কর্মচারীকে জড়িয়ে গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশের পর অভিযোগটি সামনে আসায় গত ৩১ আগস্ট সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মনিকা পারভীন তাদেরকে শোকজ করেন। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি তার,গত ৯ সেপ্টেম্বর বুধবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক অফিস আদেশে শিক্ষা কর্মকর্তাকেই বদলী করা হয়।
সমালোচনা চলছে ষড়যন্ত্রকারীদের কথায় উৎসাহিত হয়ে কর্তৃপক্ষ তদন্ত না করেই একজন দক্ষ কর্মকর্তাকে সদর থেকে সরিয়ে দিতেই বদলী সংক্রান্ত এমন আদেশ জারী করেছেন। সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে বদলীর এই আদেশ স্থগিত করে সদরের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সহযোগিতা করতে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবীও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
মনিকা পারভীন একজন শিক্ষা বান্ধব সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। তিনি ময়মনসিংহ সদরে যোগদানের পর থেকে শিক্ষার গুনগত মানোন্নয়নে তার নিরলস প্রচেষ্ঠায় স্বচ্ছতা, সাহসী পদক্ষেপ ও আন্তরিকতার মাধ্যমে গত দুই বছরের কর্মকালেই সদরবাসীর আস্থা অর্জন করেছেন। তিনি তার দক্ষতায় ময়মনসিংহ সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসাবে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ট কর্মকর্তা হিসাবে সম্মাননা পেয়েছেন। এর আগে তিনি গৌরীপুর উপজেলাতেও দায়িত্ব পালন করে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন।
এদিকে শিক্ষার মানোন্নয়নে সদরে দিনরাত ছুটে চলা এমন এক দক্ষ-সৎ ও মানবিক, ছাত্রবান্ধব শিক্ষা কর্মকর্তার বদলীর আদেশ টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার উপজেলার শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মাঝে চরম হতাশার সৃষ্টি হয়। উপজেলার বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানায়- দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিক্ষার মানোন্নয়নে ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ক্লাশে ফেরানো, অবহেলিত স্কুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, যাতায়াত ব্যবস্থা উপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার দক্ষ নেতৃত্বে আগের তুলনায় বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন অনেক বেড়েছে বলেও জানান স্থানীয়রা।
অভিভাবকদের মতে, সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং দ্রুত সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া ছিল তার কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে অল্প সময়েই তিনি উপজেলার গরীব অসহায় মেধাবী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে সৎ, দক্ষ ও জনবান্ধব কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পান।
তার বদলির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
বদলির বিষয়ে মনিকা পারভীন বলেন, ‘আমাদের কার্যালয় নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করেছি। আদেশে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে বদলি করা হয়েছে। বদলির নির্দিষ্ট কোনো কারণ আছে কি না, তা আমার জানা নেই।’
ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ‘যেকোনো কর্মকর্তা সরকারি আদেশে যেকোনো সময় বদলি হতে পারেন। শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনকে বদলির পেছনে আলাদা কোনো কারণ আছে কি না, আমার জানা নেই বলে জানালেও সদরের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্রত দক্ষ এই শিক্ষা অফিসারের বদলীর আদেশ স্থগিতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন উপজেলার শিক্ষক ও অভিভাবকরা।