এক সময় তারল্য সংকট ও আর্থিক বিপর্যয়ে জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক জনতা ব্যাংক পিএলসি এখন ঘুরে দাঁড়ানোর পথে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোঃ মজিবর রহমানের দক্ষ নেতৃত্বে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছে হারানো আস্থা ও গৌরব।
দায়িত্ব গ্রহণের সময় ব্যাংকটির তারল্য ঘাটতি ছিল প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে তিনি সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আমানত বৃদ্ধি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একাধিক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিশেষ করে ১০০ দিনের আমানত সংগ্রহ কর্মসূচি এবং নতুন ব্যাংকিং পণ্য চালুর ফলে এক বছরের মধ্যেই ব্যাংকের আমানত বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। তারল্য সংকট কমেছে, এলসি বকেয়া শূন্যে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, তারল্য সংকট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে এবং বর্তমানে তা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) বকেয়া সম্পূর্ণ পরিশোধ করা হয়েছে, যা ব্যাংকের জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রেমিট্যান্স আহরণেও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। জনতা ব্যাংক এখন দেশের শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং এ খাতে পুরস্কারও অর্জন করেছে।
ডিজিটাল সেবায় নতুন মাত্রা ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ‘ই-জনতা’তে যুক্ত হয়েছে আধুনিক সব সেবা। গ্রাহকরা এখন ঘরে বসেই ট্রেজারি চালান, এনপিএসবি’র মাধ্যমে অন্য ব্যাংকে টাকা স্থানান্তর, মোবাইল রিচার্জ, বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন লেনদেন করতে পারছেন।
মানবসম্পদ উন্নয়নেও গুরুত্ব ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে জট কমিয়ে নিয়মিত ফাউন্ডেশন কোর্স চালু করা হয়েছে। ফলে কর্মীদের দক্ষতা ও মনোবল বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অতীত সংকট থেকে উত্তরণ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জনতা ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। পরিচালন মুনাফা থাকলেও প্রভিশন ও কর পরিশোধের পর ব্যাংকটি ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসানে পড়ে। এতে গ্রাহকদের আস্থাও কমে যায়।
পরবর্তীতে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এনে অভিজ্ঞ ব্যাংকার মোঃ মজিবর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর কঠোর শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে ব্যাংকটির পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করেন।
এমডির বক্তব্য সাক্ষাৎকারে মোঃ মজিবর রহমান বলেন,“জনতা ব্যাংক একটি শক্তিশালী ব্যাংক। আমরা গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। গত আট মাসেই প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার নতুন আমানত এসেছে।”তিনি আরও বলেন,
“অতীতে বিপুল এলসি বকেয়া ছিল, আমরা তা শূন্যে নামিয়ে এনেছি। এখন বড় বড় প্রকল্প মূল্যায়ন শুরু হয়েছে এবং ব্যাংকের কার্যক্রমে নতুন গতি এসেছে।”কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছেব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। ঋণ বিতরণ ও আদায়ে গতি এসেছে, অবলোপনকৃত ঋণ আদায় জোরদার করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে স্বচ্ছতা ফিরে এসেছে।ভবিষ্যৎ লক্ষ্যব্যাংকের সিইও জানান, জনতা ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। একই সঙ্গে উৎপাদনমুখী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন,“আমাদের লক্ষ্য শুধু ব্যাংকের স্থিতিশীলতা নয়, দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখা।”প্রবাসী আয়ে ভূমিকা
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের একটি বড় অংশ জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে বলে জানান তিনি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দক্ষ নেতৃত্ব, সুশাসন ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে সংকট কাটিয়ে পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছে জনতা ব্যাংক। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ব্যাংকটি আবারও দেশের অন্যতম শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।