টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে কথিত ‘সালিশি বিচার’কে ঘিরে যে ঘটনাটি সামনে এসেছে, তা শুধু বিতর্কিতই নয়—বরং সরাসরি ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অর্জুনা ইউনিয়নের বোরাড় বয়ড়া গ্রামে একটি তথাকথিত সালিশি বৈঠকে চরম অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। একটি মেয়ে-সংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সালিশি বসানো হলেও অবাক করার বিষয়, অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ছেলে ও মেয়ে—দু’জনের কেউই সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অথচ তাদের অনুপস্থিতিতেই একতরফাভাবে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানার রায় ঘোষণা করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, এই সালিশি বৈঠকের নেতৃত্ব দেন অর্জুনা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান দেলশাদ। তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আব্দুল ফরিদ এবং কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি, যার মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুব মোল্লার ভাই মোনায়েন মোল্লার নামও উঠে এসেছে। রায় কার্যকরের নামে অভিযুক্ত পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা তাৎক্ষণিকভাবে আদায় করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
এই ঘটনায় এলাকাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামবাসীর সরাসরি প্রশ্ন—যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই উপস্থিত নেই, সেখানে কিসের বিচার? কাদের জন্য এই রায়? এটি কি বিচার, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহারের নগ্ন উদাহরণ? তারা এই সালিশি রায়কে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার আরও উদ্বেগজনক দিক হলো, যে মেয়েকে কেন্দ্র করে পুরো বিষয়টি দাঁড় করানো হয়েছে, তিনি নিজেই এই তথাকথিত সালিশ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, সালিশের নামে মেয়ের পক্ষের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা দাবি এবং আদায়ের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে মোনায়েন মোল্লার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এই ঘটনা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে—কিছু ব্যক্তি নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করার চেষ্টা করছেন। এমন একতরফা ও অস্বচ্ছ সালিশি কার্যক্রম দেশের প্রচলিত আইনব্যবস্থার পরিপন্থী এবং ন্যায়বিচারের জন্য সরাসরি হুমকি।
এখন প্রশ্ন একটাই—প্রশাসন কি এই ঘটনায় নীরব দর্শক হয়ে থাকবে, নাকি দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে? এখনো পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না আসায় জনমনে আরও সন্দেহ ও ক্ষোভ দানা বাঁধছে।
এই ধরনের বিচারহীনতা যদি রুখে না দেওয়া হয়, তবে তা সমাজে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে—যেখানে ন্যায় নয়, প্রভাবই হয়ে উঠবে শেষ কথা।